একটি তারার ভর কীভাবে নির্ণয় করা হয় _তারার ভর ও নাক্ষত্রিক বিবর্তন |
ভর জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আকাশের বস্তুগুলো আমাদের থেকে এতটাই দূরে যে আমরা সেগুলো ছুঁতে পারি না, এমনকি প্রচলিত উপায়ে ওজন করাও অসম্ভব। তাহলে প্রশ্ন আসে—জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কীভাবে মহাকাশের তারাগুলোর ভর নির্ণয় করেন? উত্তরটা সহজ নয়, তবে বেশ চমকপ্রদ।
| তারা এবং ভরের গুরুত্ব |

একটি সাধারণ তারা সাধারণত একটি গ্রহের তুলনায় অনেক বেশি ভরবিশিষ্ট হয়। কিন্তু তারার ভর জানাটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ একটি তারার ভরই বলে দেয়— •তারাটি কীভাবে জন্মেছে •বর্তমানে কী অবস্থায় আছে •ভবিষ্যতে কীভাবে তার জীবন শেষ হবে
অর্থাৎ,তারার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বুঝতে হলে তার ভর জানা অত্যন্ত জরুরি।
Astronomers using the Hubble Space Telescope identified nine monster stars with masses more than 100 times the Sun's mass. They lie in the star cluster R136 in the nearby Large Magellanic Cloud. Mass is an important characteristic when figuring out the life spans of stars. NASA/ESA/STScI
| সরাসরি ভর মাপা কেন সম্ভব নয়? |

তারাগুলো এত দূরে যে সরাসরি তাদের ওজন মাপা যায় না। তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পরোক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এসব পদ্ধতিতে মূলত তারার মাধ্যাকর্ষণজনিত প্রভাব, আলো ও গতি বিশ্লেষণ করা হয়।
A Hubble Space Telescope image of Sirius A and B, a binary system 8.6 light-years away from Earth. NASA/ESA/STScI
| তারার ভর কীভাবে নির্ণয় করা হয় |
| গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং পদ্ধতি |
তারার ভর নির্ণয়ের একটি আধুনিক পদ্ধতি হলো গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং পদ্ধতি। কোনো ভারী বস্তু তার মাধ্যাকর্ষণের কারণে আশপাশ দিয়ে যাওয়া আলোর পথ বাঁকিয়ে দেয় এই বাঁক খুব সামান্য হলেও সূক্ষ্ম পরিমাপের মাধ্যমে তা ধরা যায় তাই আলো কতটা বাঁকছে, তা বিশ্লেষণ করে ওই বস্তুর ভর নির্ণয় করা সম্ভব
২১শ শতকে এসে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে তারার ভর নির্ণয় করতে শুরু করেন।
| দ্বৈত তারা ব্যবস্থা দিয়ে ভর নির্ণয় |
গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং ব্যবহারের আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মূলত দ্বৈত তারা (Binary Star) ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতেন। দ্বৈত তারা হলো এমন দুটি তারা, যারা একটি সাধারণ ভরকেন্দ্রের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।
কীভাবে ভর নির্ণয় করা হয়?
- প্রথমে তারাগুলোর কক্ষপথ পরিমাপ করা হয়
- তারা কত গতিতে ঘুরছে তা নির্ণয় করা হয়
- একটি পূর্ণ কক্ষপথ সম্পন্ন করতে কত সময় লাগে (অরবিটাল পিরিয়ড) তা হিসাব করা হয়
এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে তারার ভর নির্ণয় করা হয়।
| গাণিতিক সূত্রের ব্যবহার |
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তারার ভর নির্ণয়ে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র ব্যবহার করেন। একটি পরিচিত সমীকরণ হলো—
V = √(GM/R)
এখানে,
- V = কক্ষপথের গতি
- G = মহাকর্ষ ধ্রুবক
- M = ভর
- R = কক্ষপথের ব্যাসার্ধ
সমীকরণটি পুনর্বিন্যাস করে খুব সহজেই তারার ভর বের করা যায়।
| উজ্জ্বলতা ও তাপমাত্রা থেকেও ভর অনুমান |
সব তারা কিন্তু দ্বৈত ব্যবস্থায় থাকে না। সেক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তারার—উজ্জ্বলতা,তাপমাত্রা ও রঙ বিশ্লেষণ করে ভর সম্পর্কে ধারণা নেন। উজ্জ্বল ও বেশি গরম তারাগুলো সাধারণত বেশি ভরবিশিষ্ট হয়। আর কম উজ্জ্বল ও ঠান্ডা তারাগুলোর ভর তুলনামূলকভাবে কম।
| হার্টজস্প্রাং–রাসেল (H-R) ডায়াগ্রাম |
তারার তাপমাত্রা, রঙ ও উজ্জ্বলতার একটি গ্রাফকে বলা হয় হার্টজস্প্রাং–রাসেল ডায়াগ্রাম। এই ডায়াগ্রামে তারাগুলো একটি বাঁকানো রেখা বরাবর অবস্থান করে, যাকে বলা হয় মেইন সিকোয়েন্স। মেইন সিকোয়েন্সে থাকা তারাগুলোর ভর মাঝামাঝি ধরনের হয় এবং সবচেয়ে ভারী ও সবচেয়ে হালকা তারাগুলো মেইন সিকোয়েন্সের বাইরে অবস্থান করে
এই ডায়াগ্রাম দেখেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তারার ভর সম্পর্কে ভালো ধারণা পান।
| তারার বিবর্তনে ভরের ভূমিকা |

তারার জন্ম,জীবন ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতাকে বলা হয় নাক্ষত্রিক বিবর্তন (Stellar Evolution)। একটি তারার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো তার প্রাথমিক ভর। কম ভরের তারা সাধারণত ঠান্ডা ও কম উজ্জ্বল, বেশি ভরের তারা খুব গরম ও উজ্জ্বল হয়। সূর্যের মতো মাঝারি ভরের তারা শান্তভাবে জীবন শেষ করে এবং সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি ভরের তারা সুপারনোভা বিস্ফোরণে মারা যায় ।
তারার রঙ, তাপমাত্রা ও অবস্থান দেখে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তার ভর এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করতে পারেন।
Composite image of the Crab Nebula, a supernova remnant that heralded the death of a very massive star. NASA/ESA/ASU/J. Hester & A. Loll
| সময়ের সাথে তারার ভর কমে যায় |
তারারা সারা জীবন একই ভর ধরে রাখে না। তারা ধীরে ধীরে নিউক্লিয়ার জ্বালানি খরচ করে । জীবনের শেষ দিকে ভরের বড় একটি অংশ মহাকাশে ছড়িয়ে দেয় । সূর্যের মতো তারা প্ল্যানেটারি নেবুলা তৈরি করে এবং ভারী তারা সুপারনোভা বিস্ফোরণে বিশাল পরিমাণ ভর হারায় ।
এই পর্যবেক্ষণগুলো ভবিষ্যতের তারাগুলোর আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে দারুণভাবে সাহায্য করে।
| শেষ কথা |
তারাকে সরাসরি ছুঁয়ে বা ওজন করে তার ভর মাপা সম্ভব নয়। কিন্তু আলো,গতি,কক্ষপথ ও তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে তারার ভর নির্ণয় করতে পারেন। এই তথ্যের ভিত্তিতেই তারা বুঝতে পারেন একটি তারা কীভাবে জন্মাবে, কতদিন বাঁচবে এবং কীভাবে তার জীবন শেষ হবে। তারার ভর বোঝার মধ্য দিয়েই আমরা আসলে আমাদের সূর্য এবং পুরো মহাবিশ্বকে আরও গভীরভাবে জানতে পারি।
দ্রুত তথ্য (Fast Facts)
- একটি তারার ভর তার জীবনকাল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে
- জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সরাসরি নয়, পরোক্ষ পদ্ধতিতে তারার ভর নির্ণয় করেন
- বেশি ভরের তারার আয়ু সাধারণত কম হয়
- সূর্যের মতো মাঝারি ভরের তারার পরিণতি ভারী তারার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন
নিবন্ধ: এফ. রহমান
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট