জ্যোতির্বিদ্যায় কিছুই পারফেক্ট নয় ! গ্রহ, কক্ষপথ ও নক্ষত্রের বাস্তব রূপ। |
মহাকর্ষ, ঘূর্ণন, তাপ, চাপ ও সময়ের প্রভাবে প্রতিটি মহাজাগতিক বস্তু একটু একটু করে বদলে যায়। কোথাও সামান্য চ্যাপ্টা আকৃতি, কোথাও কক্ষপথের সূক্ষ্ম বাঁক, আবার কোথাও নক্ষত্রের আলো ও আকারের ধীর পরিবর্তন। এই অসম্পূর্ণতাগুলোই আসলে মহাবিশ্বকে জীবন্ত ও গতিশীল করে তোলে।
এই লেখায় আমরা গ্রহ, কক্ষপথ ও নক্ষত্রের সেই বাস্তব রূপের দিকেই তাকাব, যেখানে নিখুঁততার বদলে প্রকৃতির স্বাভাবিক অনিয়মই জ্যোতির্বিদ্যার সবচেয়ে বড় সত্য।
| মহাবিশ্বে পরিপূর্ণতা আসলে কী? |
মহাবিশ্বে “পরিপূর্ণতা” বলতে কোনো নিখুঁত আকার, চূড়ান্ত ভারসাম্য বা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাওয়া অবস্থাকে বোঝায় না। বরং এটি বোঝায় এমন একটি অবস্থা, যেখানে মহাবিশ্ব তার নিজস্ব নিয়মে ক্রমাগত পরিবর্তন, বিস্তার ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে সবকিছু স্থির নয়, আবার বিশৃঙ্খলও নয়। এই ধারাবাহিক চলমান প্রক্রিয়াটিকেই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে পরিপূর্ণতা হিসেবে ধরা হয়।
মহাবিশ্বের জন্মের পর থেকে শক্তি ও পদার্থ বিভিন্ন কাঠামোতে গঠিত হয়েছে। গ্যাস থেকে নক্ষত্র, নক্ষত্র থেকে গ্যালাক্সি, আবার নক্ষত্রের মৃত্যুর মাধ্যমে নতুন মৌল সৃষ্টি হয়েছে। এই চক্রের ভেতরেই মহাবিশ্ব ধীরে ধীরে আরও জটিল ও সমৃদ্ধ হয়েছে। পরিপূর্ণতা এখানে কোনো শেষ গন্তব্য নয়, বরং একটি চলমান ভারসাম্য, যেখানে সৃষ্টি ও ধ্বংস একসাথে কাজ করে।
দার্শনিকভাবে দেখলে, মহাবিশ্বের পরিপূর্ণতা মানে প্রতিটি ঘটনা একটি কারণের সাথে যুক্ত এবং সবকিছু প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে ঘটে। আবার মানুষের দৃষ্টিতে পরিপূর্ণতা মানে হতে পারে মহাবিশ্বের সেই বিস্ময়কর সামঞ্জস্য, যেখানে অগণিত নক্ষত্র, গ্রহ ও গ্যালাক্সি একই ভৌত নিয়মে পরিচালিত হয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, মহাবিশ্বে পরিপূর্ণতা কোনো নিখুঁত স্থির অবস্থা নয়। এটি হলো পরিবর্তন, নিয়ম, সামঞ্জস্য এবং ধারাবাহিক বিবর্তনের একটি বিস্তৃত ও গভীর ধারণা, যা আমাদের মহাবিশ্বকে আজকের এই রূপে গড়ে তুলেছে। এই বাস্তবতাই আমাদের শেখায়—জ্যোতির্বিদ্যায় নিখুঁত বা পারফেক্ট কিছু নেই।
| গ্রহ: নিখুঁত গোলক নয় |
অনেকে মনে করেন গ্রহ মানেই একেবারে নিখুঁত গোলাকার বস্তু। বাস্তবে কিন্তু গ্রহগুলো সম্পূর্ণ গোলক নয়। দূর থেকে দেখলে এগুলো গোল মনে হলেও কাছ থেকে বা বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করলে দেখা যায়, গ্রহের আকারে সামান্য হলেও বিকৃতি থাকে।এর প্রধান কারণ হলো গ্রহের ঘূর্ণন। একটি গ্রহ যখন নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরে, তখন কেন্দ্রমুখী বলের কারণে তার মধ্যভাগ কিছুটা ফুলে ওঠে এবং মেরু অঞ্চল সামান্য চ্যাপ্টা হয়ে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় অবলেট স্ফেরয়েড।
পৃথিবী নিজেও পুরোপুরি গোল নয়; এর নিরক্ষীয় ব্যাস মেরু ব্যাসের চেয়ে একটু বেশি।এছাড়া গ্রহের অভ্যন্তরীণ গঠন, ভরবণ্টন এবং মহাকর্ষীয় প্রভাবও আকারকে প্রভাবিত করে। বৃহৎ গ্যাসীয় গ্রহ যেমন বৃহস্পতি ও শনি খুব দ্রুত ঘোরে, তাই তাদের ক্ষেত্রে এই চ্যাপ্টা ভাব আরও স্পষ্ট।
বিপরীতে, ছোট ও ধীরে ঘূর্ণনশীল গ্রহগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি গোলাকার দেখায়। আরও একটি বিষয় হলো পৃষ্ঠের উঁচু-নিচু অংশ। পাহাড়, গর্ত, আগ্নেয়গিরি ও গভীর উপত্যকার কারণে গ্রহের পৃষ্ঠ কখনোই সম্পূর্ণ মসৃণ হয় না। এসব বৈশিষ্ট্যও গ্রহকে নিখুঁত গোলক হতে বাধা দেয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, গ্রহগুলো প্রকৃতির নিয়ম মেনে গঠিত বাস্তব বস্তু। তাই তারা আদর্শ জ্যামিতিক গোলক নয়। এই সামান্য অসম্পূর্ণতাই গ্রহগুলোর গঠন, ইতিহাস ও ভৌত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
| কক্ষপথ: বৃত্ত নয়,উপবৃত্ত |
সাধারণভাবে আমরা ভাবি গ্রহ বা উপগ্রহ সূর্য কিংবা গ্রহের চারদিকে একেবারে গোল বৃত্তে ঘোরে। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। মহাকাশে অধিকাংশ কক্ষপথই নিখুঁত বৃত্ত নয়, বরং উপবৃত্তাকার বা এলিপটিক্যাল।
এর কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন জোহানেস কেপলার। তার প্রথম সূত্র অনুযায়ী, প্রতিটি গ্রহ সূর্যের চারদিকে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘোরে এবং সূর্য সেই উপবৃত্তের এক ফোকাসে অবস্থান করে, কেন্দ্রে নয়। এর ফলে গ্রহ কখনো সূর্যের একটু কাছে আসে, আবার কখনো কিছুটা দূরে সরে যায়।এই কাছাকাছি ও দূরে যাওয়ার ফলে গ্রহের গতিতেও পরিবর্তন ঘটে। সূর্যের কাছে থাকলে গ্রহ দ্রুত চলে, আর দূরে গেলে তার গতি কমে যায়। এটিই কেপলারের দ্বিতীয় সূত্রের মূল ধারণা।
পৃথিবীর ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি প্রযোজ্য, যদিও পৃথিবীর কক্ষপথ প্রায় বৃত্তাকার মনে হয় কারণ এর উপবৃত্তত্ব খুবই কম। কক্ষপথ উপবৃত্ত হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা রাখে মহাকর্ষ এবং বস্তুর প্রাথমিক গতি। এই দুইয়ের ভারসাম্যেই কক্ষপথের আকার নির্ধারিত হয়। কোনো ক্ষেত্রে এই উপবৃত্ত খুব বেশি লম্বাটে হতে পারে, যেমন ধূমকেতুর কক্ষপথ।
সংক্ষেপে বলা যায়, মহাকাশে কক্ষপথ মানেই নিখুঁত বৃত্ত নয়। উপবৃত্তাকার কক্ষপথই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম, যা গ্রহের গতি, ঋতু এবং সৌরজগতের সামগ্রিক গঠন বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
| সূর্য: নিখুঁত নয় এমন একটি নক্ষত্র |
দূর থেকে সূর্যকে একেবারে নিখুঁত, মসৃণ ও গোলাকার মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে সূর্য কোনো আদর্শ বা নিখুঁত নক্ষত্র নয়। এটি একটি অত্যন্ত সক্রিয় ও পরিবর্তনশীল নক্ষত্র, যার ভেতর ও পৃষ্ঠে প্রতিনিয়ত নানা জটিল প্রক্রিয়া চলছে।
প্রাচীন দার্শনিক অ্যারিস্টটল বিশ্বাস করতেন যে চাঁদের বাইরের সমস্ত মহাবিশ্ব নিখুঁত। তাঁর মতে, আকাশীয় বস্তুগুলো ছিল পরিবর্তনহীন ও সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ। এই ধারণায় বড় ধাক্কা আসে গ্যালিলিও গ্যালিলেই-এর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। তিনি যখন টেলিস্কোপ দিয়ে সূর্যের দিকে তাকালেন, তখন আবিষ্কার করলেন সূর্যের পৃষ্ঠে অন্ধকার অঞ্চল রয়েছে, যেগুলোকে আমরা আজ সানস্পট (Sunspots) নামে চিনি।
সূর্য মূলত উত্তপ্ত গ্যাস ও প্লাজমার তৈরি। এর ভেতরে পারমাণবিক সংযোজনের মাধ্যমে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়, যা আলো ও তাপ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলোর কারণে সূর্যের পৃষ্ঠ কখনোই পুরোপুরি শান্ত বা সমান থাকে না। সূর্যপৃষ্ঠে নিয়মিতভাবে সূর্যকলঙ্ক দেখা যায়, যেগুলো আশপাশের অংশের তুলনায় ঠান্ডা ও অন্ধকার। এছাড়া সূর্যে রয়েছে শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র। এই চৌম্বকীয় প্রভাবের কারণেই সৌর বিস্ফোরণ, ফ্লেয়ার ও করোনাল মাস ইজেকশনের মতো ঘটনা ঘটে।
এসব ঘটনার ফলে সূর্যের পৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, যা পৃথিবীর মহাকাশ পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে। আকারের দিক থেকেও সূর্য পুরোপুরি নিখুঁত গোল নয়। সূর্যের ঘূর্ণন ও অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার কারণে এর নিরক্ষীয় অংশ সামান্য স্ফীত। যদিও এই পার্থক্য খুব ক্ষুদ্র, তবুও এটি দেখায় যে সূর্য কোনো আদর্শ জ্যামিতিক বস্তু নয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, সূর্য একটি জীবন্ত, সক্রিয় এবং ক্রমাগত পরিবর্তনশীল নক্ষত্র। এর এই নিখুঁত না হওয়াই আসলে সূর্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে এবং আমাদেরকে নক্ষত্রের প্রকৃত স্বভাব বুঝতে সাহায্য করে।
| জ্যোতির্বিদ্যায় “পারফেক্ট” কেন সম্ভব নয়? |
জ্যোতির্বিদ্যায় “পারফেক্ট” বা নিখুঁত ধারণাটি বাস্তবে প্রযোজ্য নয়, কারণ মহাবিশ্ব নিজেই একটি গতিশীল ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা। এখানে কোনো বস্তু, গতি বা গঠন স্থির নয়। নক্ষত্র জন্ম নেয়, বিবর্তিত হয় এবং একসময় মৃত্যুবরণ করে। গ্রহের কক্ষপথ বদলায়, গ্যালাক্সি একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। এই চলমান পরিবর্তনের মধ্যেই মহাবিশ্ব পরিচালিত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো প্রকৃতির নিয়মগুলো আদর্শ জ্যামিতি অনুসরণ করে না। গ্রহ নিখুঁত গোলক নয়, কক্ষপথ নিখুঁত বৃত্ত নয়, এমনকি নক্ষত্রও পুরোপুরি সমান ও স্থির নয়।
আমাদের গণিত ও মডেলগুলো বাস্তবতাকে বোঝার জন্য সরলীকরণ করে, কিন্তু প্রকৃত মহাবিশ্ব সেই আদর্শ সীমার বাইরে কাজ করে। পরিমাপের সীমাবদ্ধতাও একটি বড় কারণ। আমরা যন্ত্রের মাধ্যমে যা দেখি, তা সবসময় সম্পূর্ণ বা নিখুঁত নয়। আলো আসতে সময় লাগে, দূরত্ব যত বেশি হয়, তথ্য তত পুরোনো হয়। তাছাড়া পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের সংবেদনশীলতা ও নির্ভুলতারও একটি সীমা আছে। ফলে যেকোনো পরিমাপেই কিছু না কিছু অনিশ্চয়তা থেকে যায়। এছাড়া মহাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা ও আকস্মিকতারও ভূমিকা আছে। চৌম্বকীয় অস্থিরতা, মহাকর্ষীয় মিথস্ক্রিয়া, বিস্ফোরণ বা সংঘর্ষের মতো ঘটনা নিখুঁত পূর্বাভাসকে অসম্ভব করে তোলে। তাই জ্যোতির্বিদ্যা নিশ্চিত সত্যের চেয়ে সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলে।
সংক্ষেপে বলা যায়, জ্যোতির্বিদ্যায় “পারফেক্ট” সম্ভব নয়, কারণ মহাবিশ্ব কোনো স্থির, আদর্শ বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নয়। বরং এর সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এই অসম্পূর্ণতা, পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই, যা আমাদেরকে আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহ জাগায়।
| শেষ কথা |
জ্যোতির্বিদ্যায় কিছুই পারফেক্ট নয়—এটাই মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর সত্য। নিখুঁত গোলক নেই, নিখুঁত কক্ষপথ নেই, নিখুঁত নক্ষত্রও নেই। অথচ এই অপূর্ণতাগুলোই মহাবিশ্বকে জীবন্ত, গতিশীল ও অনুসন্ধানযোগ্য করে তুলেছে।এই উপলব্ধি আমাদের শুধু মহাবিশ্ব নয়, বরং প্রকৃতি ও বিজ্ঞানকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
নিবন্ধ: এফ. রহমান
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট