News & Articles
You will get the latest news about Astronomy
2026 January 14
32 views

চাঁদের আলো আসলে কী? বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা,

ভুল ধারণা ও লোককথার প্রেক্ষাপট

রাতের আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ দেখলেই আমাদের মনে হয়, চাঁদ বুঝি নিজেই আলো ছড়াচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি চাঁদ নিজের আলো তৈরি করে? নাকি এর পেছনে রয়েছে সূর্যের আলো ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক চমৎকার ব্যাখ্যা? 

চাঁদ আসলে কোনো আলোর উৎস নয়। চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। আমরা যে আলো দেখি, সেটি সূর্যের আলো। সূর্য থেকে নির্গত আলো চাঁদের পৃষ্ঠে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই প্রতিফলিত সূর্যালোককেই আমরা চন্দ্রালোক বলে থাকি।


চাঁদের পৃষ্ঠে অসংখ্য গর্ত, পাহাড় ও ধূলিকণা রয়েছে। এগুলো সূর্যের আলো সমানভাবে প্রতিফলিত করতে পারে না। তাই চাঁদের আলো কখনো খুব উজ্জ্বল, কখনো আবার তুলনামূলকভাবে মৃদু মনে হয়। এই লেখায় আমরা জানব চাঁদ কীভাবে আলো দেয়, চন্দ্রালোকের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক উৎস কী, এবং চাঁদকে ঘিরে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা আসলে কেন ভুল।

চাঁদ কি আবর্তন করে?

চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, এটা সবাই জানে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চাঁদ কি নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরে?উত্তর হলো, হ্যাঁ। চাঁদ নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরে বলেই আমরা সব সময় এর একই পৃষ্ঠ দেখি। চাঁদ যদি আবর্তন না করত, তাহলে কক্ষপথের বিভিন্ন অবস্থানে আমরা এর বিভিন্ন অংশ দেখতে পেতাম।


পৃথিবী ঘুরছে সুর্যের চারদিকে, আর চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে

বাস্তবে চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে যত সময় নেয়, ঠিক তত সময়েই একবার নিজের অক্ষের চারদিকে আবর্তন সম্পন্ন করে। একে বলা হয় সিঙ্ক্রোনাস রোটেশন। এই কারণেই আমরা সব সময় চাঁদের একই দিক দেখি। যদিও বিভিন্ন সূক্ষ্ম কারণে মোটামুটি ৫৯% পর্যন্ত চন্দ্রপৃষ্ঠ আমরা আলাদা আলাদা সময়ে দেখতে পারি, তবে একসাথে কখনোই ৫০% এর বেশি দেখা যায় না।

চাঁদের দীপন ও উজ্জ্বলতা

চাঁদের আলোর তীব্রতা বা দীপন (illuminance) সরাসরি নির্ভর করে চন্দ্রকলার ওপর।

  • সাধারণ পূর্ণিমায় চাঁদের দীপন সাধারণত ০.০৫ থেকে ০.১ লাক্স।
  • চাঁদ যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে থাকে, অর্থাৎ সুপারমুনের সময়, তখন পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে এই মান সর্বোচ্চ প্রায় ০.৩২ লাক্স পর্যন্ত হতে পারে।
  • তুলনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীতে পৌঁছানো পূর্ণচন্দ্রের আলো সূর্যের আলোর মাত্র ১/৩৮০,০০০ অংশ।

সূর্যের আলোর মাধ্যমে পৃথিবী ও চাঁদ দুজনেই একে অপরকে আলোকিত করে

চাঁদের প্রতিফলন ক্ষমতা ও আলো পৌঁছাতে সময়

চাঁদের প্রতিফলন অনুপাত (Albedo) মাত্র ০.১৩৬। অর্থাৎ চাঁদের ওপর পড়া সূর্যের আলোর মাত্র ১৩.৬% প্রতিফলিত হয়। এই প্রতিফলিত আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে সময় নেয় প্রায় ১.২৬ সেকেন্ড।

এরপর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কণিকায় আলো বিচ্ছুরিত হয়ে রাতের আকাশকে উজ্জ্বল করে তোলে। এর ফলে দুর্বল তারা ও ক্ষীণ গভীর-আকাশের বস্তু দেখা কঠিন হয়ে যায়।এই কারণেই জ্যোতির্বিদরা সাধারণত পূর্ণিমার সময় মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এড়িয়ে চলেন।

চন্দ্রকলায় আলো কম–বেশি দেখানোর কারণ 

চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার সময় সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের অবস্থান বদলে যায়। এর ফলেই আমরা চাঁদের বিভিন্ন কলা দেখতে পাই,

যেমন:

  •  অমাবস্যা
  • শুক্লপক্ষ
  • পূর্ণিমা


আবর্তন ও প্রদক্ষিণের পার্থক্য

পূর্ণিমার সময় চাঁদের পুরো আলোকিত অংশ পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে, তাই তখন চাঁদ সবচেয়ে উজ্জ্বল দেখায়। আর অমাবস্যার সময় আলোকিত অংশ আমাদের দিকের বিপরীতে থাকায় চাঁদ প্রায় দেখা যায় না। প্রথম ও শেষ চতুর্থকে চাঁদের অর্ধেক অংশ আলোকিত হলেও এর উজ্জ্বলতা পূর্ণিমার মাত্র প্রায় ১/৮ অংশ।

চাঁদের কক্ষপথের অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিভিন্ন চন্দ্রকলা দেখি। এই সময় চাঁদ সাধারণত মধ্যরাতে উদিত হয় বা অস্ত যায় এবং চাঁদ প্রতি মাসে বিভিন্ন নক্ষত্রের আশেপাশে দেখা যায়, যেমন চিত্রা, আলডেবারান ইত্যাদি।

চাঁদের আলো নীলচে কেন মনে হয়?

অনেকের চোখে পূর্ণিমার আলো হালকা নীলচে বা রূপালি বলে মনে হয়। এর পেছনে কাজ করে পার্কিঞ্জি প্রভাব। কম আলোতে মানুষের চোখ নীলাভ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বাস্তবে চাঁদের আলো নীল নয়, আর এতে কোনো “রূপালি” বৈশিষ্ট্যও নেই। এটি পুরোপুরি সূর্যের সাদা আলোর প্রতিফলন মাত্র।

লোকসাহিত্যে চাঁদের আলো

লোকসাহিত্যে পূর্ণচন্দ্রকে অনেক সময় রহস্যময় বা নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিছু লোককথায় বলা হয়, বিশেষ পূর্ণিমার রাতে চাঁদের নিচে ঘুমালে মানুষ নেকড়েমানবে পরিণত হতে পারে। একসময় বিশ্বাস করা হতো, চাঁদের আলোয় ঘুমালে মানুষ অন্ধ বা পাগল হয়ে যেতে পারে।

ক্রান্তীয় অঞ্চলে ধারণা ছিল, চাঁদের আলোয় ঘুমানোর ফলে রাতকানা রোগ হয়, যদিও বাস্তবে এটি ভিটামিন-এ এর অভাবজনিত রোগ। ঘোড়ার পুনঃপুনিক উভিটিস রোগকে একসময় “চাঁদকানা” বলা হতো, যদিও বর্তমানে চাঁদের আলোকে এর জন্য দায়ী মনে করা হয় না।

১৬শ শতাব্দীতে ধারণা ছিল, চাঁদের কিরণের প্রভাবে গুহায় “চন্দ্রদুধ” নামের খনিজ তৈরি হয়। এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবে মানুষের কল্পনা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে চাঁদের প্রভাব স্পষ্ট।

চাঁদের আলো ঠান্ডা লাগে কেন?

অনেকের ধারণা, চাঁদের আলো নাকি ঠান্ডা। বাস্তবে এটি একটি ভুল ধারণা। চাঁদের আলো কোনো ঠান্ডা আলো নয়। এটি সূর্যের আলোই, শুধু অনেক কম শক্তিশালী। রাতে চাঁদের আলোতে তাপ কম লাগে কারণ তখন চারপাশের পরিবেশ সূর্যের অনুপস্থিতিতে ঠান্ডা হয়ে যায়।

শেষ কথা

সোজা কথায় বললে, চাঁদের নিজের কোনো আলো নেই। চাঁদ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে আলোকিত করে। এটি একটি বিশাল, কিন্তু খুব কার্যকর নয় এমন প্রাকৃতিক দর্পণ। শৈশবের ভুল ধারণা ভেঙে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে চাঁদকে বুঝলে এই পরিচিত আকাশবস্তুও নতুন করে বিস্ময় জাগায়।



নিবন্ধ: এফ. রহমান

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, কর্নেল ইউনিভার্সিটি , Earth Sky