| গ্রহাণু অ্যাপোফিস: এটি কি পৃথিবীতে আঘাত করবে? |
যারা রাতের নক্ষত্র খচিত আকাশ দেখতে ভালোবাসেন এবং এই বিষয়ের উপর খোজখবর রাখেন তারা নিশ্চয় অ্যাপোফিস নামটা প্রায়শই শুনে থাকবেন।অ্যাপোফিস কি? আর কেনই বা এর নামটা প্রায়শই শুনতে হয়? চলুন জানার চেষ্টা করি এই মহাজাগতিক বস্তুটির সর্ম্পকে।
ছবি: গ্রহাণু 99942 Apophis. ইমেজ ক্রেডিট: NASA/Caltech/জপ্ল
অ্যাপোফিস পৃথিবীর কাছাকাছি একটি গ্রহাণু। যার অর্থ সূর্যের চারপাশে এর কক্ষপথ এবং এটি সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দূরত্বের 1.3 গুণের মধ্যে চলে আসে। এর পুরো নাম অ্যাপোফিস ৯৯৯৪২। ২০০৪ সালে আবিষ্কৃত হওয়ার পর, ২০৩৬ সালে পৃথিবীতে আঘাত করার একটি ছোট সম্ভাবনা ছিল।কিন্তু গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে এটি ২০২৯ বা ২০৩৬ সালে পৃথিবীতে আঘাত করবে না।আর বর্তমানে মিডিয়ার মনোযোগের কারনে এই বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার হচ্ছে।২০২৯ সালে অ্যাপোফিস আমাদের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট গুলির চেয়ে পৃথিবীর কাছাকাছি আসবে। সম্ভবত এইজন্য অ্যাপোফিস জনসাধারণের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মিশরীয় পৌরাণিক কাহিনীতে অ্যাপোফিস ছিল একটি সাপ যা ছিল সূর্য দেবতার শত্রু।সূর্যোদয়ের সময় এর কাছে পরাজিত হওয়ার আগে
প্রতি রাতে অ্যাপোফিস পৃথিবীতে অনন্ত অন্ধকার আনতে চেয়েছিল।
| অ্যাপোফিস কে আবিষ্কার করেন? |
অ্যারিজোনার কিট পিক ন্যাশনাল অবজারভেটরিতে রয় টাকার ডেভিড থোলেন এবং ফ্যাব্রিজিও বার্নার্ডি ১৯ ই জুন ২০০৪-এ অ্যাপোফিস আবিষ্কার করেছিলেন।বেশিরভাগ গ্রহাণুর মতো পৃথিবী থেকে এর সঠিক আকৃতি এবং আকার বের করা খুব কঠিন। রাডার পরিমাপের অনুমান অ্যাপোফিস প্রায় ৪৫০ মিটার (১৫০০ ফুট) চওড়া এবং ১৭০ মিটার (৫৫০ ফুট) লম্বা। যা প্রায় ৫টি ফুটবল মাঠের সমতুল্য এবং নিউ ইয়র্ক সিটির এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চেয়ে লম্বা। এটি সম্ভবত ডিমের আকৃতির মতন। ২০১৯ সালে নাসার নিউ হরাইজন মহাকাশযান এর কাছ দিয়ে উড়ে গিয়েছিলো।| অ্যাপোফিস কি পৃথিবীতে আঘাত হানবে? |
এটি অবশ্যই ২০২৯ এবং ২০৩৬ সালে পৃথিবীকে আঘাত করবে না এবং ২০২১ সালের মার্চ মাসে গ্রহাণুর ফ্লাইবাই চলাকালীন অ্যাপোফিস (Apophis) এর রাডার পর্যবেক্ষণগুলি দেখায় যে অন্তত পরবর্তী ১০০ বছরেও পৃথিবীকে আঘাত করার সম্ভবনা নেই।| পৃথিবীতে আঘাত করলে কি হবে? |
অ্যাপোফিস এর প্রভাব স্থান থেকে কয়েকশ কিলোমিটার পর্যন্ত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাবে।মুক্তি পাওয়া শক্তি ১,০০০ মেগাটন টিএনটি বা শত শত পারমাণবিক অস্ত্রের সমান হবে।| ডাইনোসররা যে গ্রহানুর কারনে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো তা কত বড় ছিলো? |
যে গ্রহাণুটি ডাইনোসর এবং সেইসাথে পৃথিবীর সমস্ত প্রজাতির ৭০% বিলুপ্তি করেছিলো, সেই গ্রহানুটি ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার প্রশস্ত
ছিল। এটি অ্যাপোফিসের চেয়ে অনেক বড় ছিল, যদিও অ্যাপোফিস-আকারের গ্রহাণু একটি বড় মেট্রোপলিটন এলাকায় আঘাত করলে
লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যেতে পারে।
ছবি: ২০১৩ সালে রাশিয়ান শহর চেলিয়াবিনস্কের উপরে একটি ১৮-মিটার চওড়া গ্রহাণু বিস্ফোরণ।এই বিস্ফোরণে অনেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শতাধিক লোক আহত হয়।
| ২০২৯ সালে Apophis (অ্যাপোফিস) পৃথিবীর কত কাছে আসবে? |
১৩ই এপ্রিল ২০২৯ এপোফিস পৃথিবীর ৩০,৬০০ কিলোমিটার (১৯,০০০ মাইল) মধ্যে চলে আসবে।| ২০৩৬ সালে অ্যাপোফিস পৃথিবীর কত কাছে আসবে? |
এই গ্রহাণুটি পরবর্তী শতাব্দীর মধ্যে পৃথিবীতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ৩০শে মার্চ ২০৩৬-এ অ্যাপোফিস ৮.৪ মিলিয়ন কিলোমিটার (৫.২ মিলিয়ন মাইল) দূর থেকে পৃথিবীকে অতিক্রম করবে,এটি পৃথিবী এবং চাঁদের মধ্যেকার দূরত্বের ২০ গুণ বেশি।
ছবি: নাসার-এর জেট প্রপালশন ল্যাব গ্রহাণু Apophis এর কক্ষপথের গতিপথ দেখায় কারণ এটি ২০২৯ সালে পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাবে।
| আমরা কি অ্যাপোফিসকে দেখতে সক্ষম হবো? |
২০২৯ সালে পৃথিবীর আকাশ অতিক্রমের সময় অ্যাপোফিস ইউরোপ, আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়া থেকে দৃশ্যমান হবে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো (৩.১ মাত্রা) এটি ২০৩৬ সালে এটি অনেক দুর থেকে পৃথিবীকে অতিক্রম করবে যার ফলে টেলিস্কোপ ছাড়া একে দেখা সম্ভব নয়।| অ্যাপোফিস কি আমাদের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটকে আঘাত করবে? |
উত্তর হলো না। অ্যাপোফিস আমাদের কিছু ভূ-স্থির উপগ্রহের চেয়ে পৃথিবীর কাছাকাছি আসবে।কিন্তু এর পথ বিষুব রেখা থেকে দূরে থাকবে এবং এই উপগ্রহগুলো যে অঞ্চলে দখল করে আছে তার মধ্য দিয়ে অ্যাপোফিস ভ্রমন করবে না।
ছবি: রাডার চিত্রে গ্রহানু অ্যাপোফিস।
| অ্যাপোফিসের মতো গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত করবে কিনা তা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কীভাবে নির্ধারণ করবেন? |
শুধুমাত্র গ্রহাণু খুঁজে বের করাই যথেষ্ট নয়- এদের গতিপথ সর্বদা পর্যবেক্ষন করা এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ট্র্যাক করা হয়।আর এর মাধ্যমে পরিমাপ করে বের করা হয় যে তারা বিভিন্ন সময়ে কোথায় আছে। এই পর্যবেক্ষণগুলি,সারা বিশ্বের পেশাদার এবং সৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দ্বারা সঞ্চালিত হয় এবং সংগ্রহিত তথ্যগুলি মাইনর প্ল্যানেট সেন্টারে জমা দেওয়া হয়।নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি এবং ইতালির NEODYS প্রোগ্রামের গ্রুপগুলি সেই পর্যবেক্ষণগুলি থেকে গ্রহাণুর কক্ষপথ গণনা করে৷
ছবি: গ্রহানু অ্যাপোফিস।
কখনও কখনও গ্রহাণুগুলি পৃথিবীর যথেষ্ট কাছাকাছি আসে তখন রাডারকে আরও সুনির্দিষ্ট দূরত্বের ডেটা পেতে ব্যবহার করা হয় যা তাদের কক্ষপথকে আরও নিখুঁত ভাবে গননা করতে পারে।
| অ্যাপোফিস পর্যবেক্ষনের জন্য মিশন পরিকল্পনা? |
নাসার OSIRIS-APEX মিশন ১৮ মাসের জন্য গ্রহাণুটি নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষন করবে ২০২৯ সালের এপ্রিল থেকে, এটি পৃথিবীর কাছাকাছি আসার ঠিক আগে। OSIRIS-APEX হল পুনর্নির্মাণ করা OSIRIS-REx মহাকাশযান যা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রহাণু বেন্নুর একটি নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিল।
OSIRIS-APEX পর্যবেক্ষন করবে কিভাবে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ অ্যাপোফিস এর ঘূর্ণন হার এবং পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্যগুলিকে পরিবর্তন করে,যা গ্রহাণুর পৃষ্ঠের নীচে কী রয়েছে তা আমাদের বুঝতে সাহায্য করতে পারে। মিশনটি আমাদেরকে অ্যাপোফিস এর মতো গ্রহাণু সম্পর্কে নতুন জানাতে সাহায্য করবে,আর এর মাধ্যমে আমরা জানার চেষ্টা করবো কীভাবে পৃথিবীতে আঘাত করার পথে একটি গ্রহানুকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে হটিয়ে দেয়া যায়।
নিবন্ধ: নেবুলা মোর্শেদ।
তথ্যসুত্র:
https://www.planetary.org/articles/will-apophis-hit-earth
https://www.dailymail.co.uk/sciencetech/article-9407817/Were-safe-Potentially-hazardous-asteroid-Apophis-NOT-collide-Earth-2068-says-NASA.html