চাঁদ কেন পৃথিবীর কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে?
|

আজ থেকে শত শত কোটি বছর আগে পৃথিবীতে একটি দিনের দৈর্ঘ্য ছিল গড়ে ১৩ ঘণ্টারও কম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দিন ধীরে ধীরে লম্বা হয়েছে, আর এখন আমরা অভ্যস্ত ২৪ ঘণ্টার দিনে। এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে পৃথিবী, চাঁদ এবং আমাদের মহাসাগরের জটিল সম্পর্ক।
চাঁদ শুধু রাতের আকাশের সৌন্দর্য নয়। পৃথিবীর ওপর তার প্রভাব গভীর এবং বহুমাত্রিক। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণেই পৃথিবীতে নিয়মিত জোয়ার ও ভাটা হয়। অনেক নিশাচর প্রাণী চাঁদের আলোকে কাজে লাগিয়ে তাদের জীবনচক্র পরিচালনা করে।
মানব সভ্যতার ইতিহাস জুড়েই চাঁদের কলা ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছে। এমনকি কিছু তত্ত্ব অনুযায়ী, চাঁদের উপস্থিতিই পৃথিবীতে জীবনের বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে সহায়তা করেছে।
কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ চাঁদটি ধীরে ধীরে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
| চাঁদ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? (সংক্ষেপে) |
বিজ্ঞানীরা মনে করেন প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গল গ্রহের আকারের থিয়া (Theia) নামের একটি বস্তু পৃথিবীর সঙ্গে ধাক্কা খায়। সেই ধাক্কার পর যে ভাঙা টুকরোগুলো মহাকাশে ছিটকে গিয়েছিল, সেগুলো জোড়া লেগে পরে চাঁদে পরিণত হয়।

ছবির ক্যাপশান,
জাদুঘরে চাঁদ থেকে আনা পাথর
| চাঁদ ও পৃথিবীর সম্পর্ক (সংক্ষেপে) |
চাঁদ হলো পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। চাঁদ না থাকলে—✔ রাত এত উজ্জ্বল হতো না ✔ জোয়ার–ভাটা থাকত না ✔ পৃথিবীর ঘূর্ণন অস্থির হত । চাঁদ আমাদের পৃথিবীর “ভারসাম্য রক্ষাকারী”।

ছবির ক্যাপশান,
চাঁদের বুক থেকে তোলা পৃথিবীর ছবি
| চাঁদ কেন দূরে যাচ্ছে? – সহজ ব্যাখ্যা |
পৃথিবী আর চাঁদ দুটোই বিশাল এক "মহাকাশীয় নাচে" জড়ানো। এ নাচের মূল কারণ হলো জোয়ার–ভাটা (Tides)। এটি বোঝার জন্য আমাদের জানতে হবে জোয়ার–ভাটা (Tides) কীভাবে কাজ করে।
- চাঁদের টান → পৃথিবীতে জোয়ার–ভাটা তৈরি করে চাঁদের মহাকর্ষীয় টানে সমুদ্র ফুলে ওঠে। এই ফুলে ওঠা পানির জায়গাটিকে বিজ্ঞানীরা বলেন “টাইল বাল্জ”।
- পৃথিবী ঘুরছে → জোয়ারও সাথে ঘুরছে পৃথিবী দ্রুত ঘোরে (চাঁদের চেয়ে অনেক দ্রুত)। ফলে এই ফুলে ওঠা পানির অংশ চাঁদের সামনে একটু এগিয়ে যায়।
- এই এগিয়ে থাকা পানি → চাঁদকে টেনে সামনে নেয় এবার ঘটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা— এই জোয়ার চাঁদকে সামনে টানে, মানে চাঁদ স্পিড পায়। চাঁদ যত স্পিড পায়, ততই সে ধীরে ধীরে উচ্চ কক্ষপথে উঠে যায় এবং আমরা দেখি—👉 চাঁদ দূরে যাচ্ছে।
| লুনার রিসেশন কী? |
চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কক্ষপথে। একই সঙ্গে সে নিজ অক্ষের ওপর এমনভাবে ঘোরে যে আমরা সবসময় তার একই পিঠ দেখতে পাই।
কিন্তু “লুনার রিসেশন” নামে একটি প্রক্রিয়ার কারণে চাঁদ প্রতি বছর সামান্য করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অ্যাপোলো মিশনের সময় চাঁদের পৃষ্ঠে বসানো প্রতিফলক ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা লেজার রশ্মির মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই দূরত্ব পরিমাপ করেছেন। ফলাফল স্পষ্ট—চাঁদ প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ সেন্টিমিটার (১.৫ ইঞ্চি) হারে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পৃথিবীর ঘূর্ণনের ওপর। দিনের দৈর্ঘ্য খুব ধীরে হলেও বাড়ছে।
| জোয়ার-ভাটা কীভাবে চাঁদকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে? |
চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর সমুদ্রের পানিকে টেনে নিয়ে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি করে। এই পানির স্ফীতি সবসময় চাঁদের ঠিক নিচে থাকে না। কারণ পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর চাঁদের কক্ষপথের চেয়ে দ্রুত ঘোরে। ফলে সমুদ্রের ফুলে ওঠা অংশটি চাঁদের অবস্থানের একটু সামনে থাকে।
চাঁদ সেই পানিকে টেনে পেছনে ধরার চেষ্টা করে। এই টানাপোড়েনের ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তি সামান্য কমে যায় এবং সেই শক্তির একটি অংশ চাঁদের কক্ষপথে চলে যায়। এর ফলেই চাঁদ ধীরে ধীরে আরও উঁচু কক্ষপথে উঠে যায়, অর্থাৎ পৃথিবী থেকে দূরে সরে যায়।
| দিনের দৈর্ঘ্য কেন বাড়ছে? |
পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হওয়ায় দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭ শতকের শেষ দিক থেকে পৃথিবীতে দিনের দৈর্ঘ্য প্রতি শতাব্দীতে গড়ে প্রায় ১–২ মিলিসেকেন্ড বেড়েছে। সংখ্যাটা ছোট মনে হলেও, কয়েকশ কোটি বছরের ইতিহাসে এটি বিশাল পরিবর্তন।
একসময় দিনে দুটি সূর্যোদয় ও দুটি সূর্যাস্ত হতো। তখন পৃথিবী এত দ্রুত ঘুরত যে দিন ছিল অনেক ছোট। এই পরিবর্তন জলবায়ু, তাপমাত্রা এবং জীবনের বিবর্তনের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
| অতীতে চাঁদ কতটা কাছে ছিল? |
আজ চাঁদ পৃথিবী থেকে গড়ে ৩,৮৪,০০০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু ভূতাত্ত্বিক তথ্য বলছে, প্রায় ৩২০ কোটি বছর আগে চাঁদ ছিল মাত্র ২,৭০,০০০ কিলোমিটার দূরে। তখন পৃথিবীর দিন ছিল অনেক ছোট এবং ঘূর্ণন ছিল অনেক দ্রুত।
চাঁদের দূরে সরে যাওয়ার গতি সবসময় একরকম ছিল না। কোনো কোনো সময়ে এই গতি বেশি ছিল, আবার কোনো সময়ে খুব ধীর। প্রায় ৫৫০–৬২৫ মিলিয়ন বছর আগে চাঁদ বছরে প্রায় ৭ সেন্টিমিটার হারে দূরে সরে যাচ্ছিল।
| বর্তমানে হার বেশি কেন? |
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বর্তমান সময়ে লুনার রিসেশনের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ার একটি বড় কারণ হলো মহাদেশ গুলোর বর্তমান অবস্থান, বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর। এই অঞ্চলে জোয়ারের সঙ্গে সমুদ্রের পানির অনুরণন তৈরি হয়, যা চাঁদের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব ফেলছে।
সহজভাবে বললে, এটি দোলনায় ছন্দমতো ধাক্কা দেওয়ার মতো। সঠিক সময়ে ধাক্কা দিলে দোলনার উচ্চতা বাড়ে। ঠিক তেমনি, মহাসাগরের আকার ও অবস্থান জোয়ারকে শক্তিশালী করে তুলছে।

ছবির ক্যাপশান,
সূর্যগ্রহণ মূলত ঘটে থাকে চাঁদের কারণে
| চাঁদ দূরে যাওয়ার প্রাচীন প্রমাণও রয়েছে! |
পুরনো প্রবাল (coral fossils) পরীক্ষা করে দেখা গেছে—👉 ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে ১ বছরের দিন সংখ্যা ছিল ৪২০ দিন, মানে প্রতিদিন ছিল ছোট। এর কারণ? ✔ পৃথিবীর ঘূর্ণন তখন ছিল দ্রুত ✔ চাঁদ ছিল অনেক কাছাকাছি এগুলো মিলিয়েই নিশ্চিত হয়— চাঁদ সত্যিই দূরে যাচ্ছে।
| 🔭 চাঁদ দূরে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ |

ছবির ক্যাপশান,
চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পদচিহ্ন
| প্রমাণ | ব্যাখ্যা |
| লেজার রিফ্লেক্টর পরীক্ষা | Apollo মিশনের রেখে যাওয়া আয়নায় লেজার পাঠিয়ে দূরত্ব মাপা হয় |
| জোয়ার–ভাটার গতি | পৃথিবীর জোয়ারের শক্তি চাঁদকে দূরে ঠেলে দেয় |
| প্রাচীন প্রবালের গঠন | কোটি বছর আগে দিনে ঘণ্টা বেশি ছিল—প্রমাণ পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হয়েছে |
| ভবিষ্যতে কি চাঁদ হারিয়ে যাবে? |
যদিও চাঁদ বর্তমানে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে, তবুও পৃথিবীকে পুরোপুরি ছেড়ে চলে যাবে—এমন সম্ভাবনা নেই। তার আগেই সূর্যের বিবর্তনের শেষ পর্যায়ে পৃথিবীর পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
তবে তাত্ত্বিকভাবে বলা যায়, ভবিষ্যতের মহাকাশচারীরা চাঁদ থেকে পৃথিবীকে আগের তুলনায় একটু বেশি দূরত্ব থেকে দেখতে পাবেন। যদিও আমাদের মানুষের জীবনকাল এতই ছোট যে দিনের দৈর্ঘ্যে যোগ হওয়া এই ক্ষুদ্র পরিবর্তন আমরা কখনোই চোখে দেখব না।
| চাঁদ দূরে গেলে পৃথিবীতে কী হবে? |
তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিপদ নেই। এটি লক্ষ লক্ষ বছরের ঘটনা।
তবে ভবিষ্যতে—
➤পৃথিবীর দিন আরও দীর্ঘ হবে ২৪ ঘণ্টার বেশি হবে কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীর হবে।
➤ ৬০০ মিলিয়ন বছর পরে পৃথিবী থেকে সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে না কারণ চাঁদ এতটাই দূরে যাবে যে সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না কারণ চাঁদ আকারে ছোট দেখাবে।
➤জোয়ার–ভাটা দুর্বল হবে সমুদ্রের ঢেউ ও জলপ্রবাহ বদলে যাবে কারণ চাঁদের টান দুর্বল হবে।
➤ জোয়ার–ভাটার ওপর নির্ভর জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ও সমুদ্র-পরিবেশ বদলাবে।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট
নিবন্ধ: এফ. রহমান