| চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কেন হয়? পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সঙ্গে গ্রহণের সম্পর্ক। |

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এসব ঘটনা কেন ঘটে এবং কীভাবে ঘটে? আসলে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এগুলো চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্যের নির্দিষ্ট অবস্থান ও ছায়ার কারণে ঘটে। এই লেখায় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কেন হয় এবং এর পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো কী।
| গ্রহণ (Eclipses) |
গ্রহণ (Eclipses) বলতে বোঝায় এমন একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা, যখন একটি মহাজাগতিক বস্তু অন্য একটি বস্তুর সামনে এসে তার ওপর পড়া আলো আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বাধা দেয়। সাধারণভাবে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের পারস্পরিক অবস্থানের কারণেই গ্রহণ ঘটে।
আমরা মূলত দুই ধরনের গ্রহণ দেখতে পাই
- একটিকে বলা হয় সূর্যগ্রহণ সূর্যগ্রহণ (Solar Eclipses)
- এবং অন্যটি চন্দ্রগ্রহণ চন্দ্রগ্রহণ (Lunar Eclipses)।
সূর্যগ্রহণ (Solar Eclipses) ঘটে তখন, যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চলে আসে। ফলে চাঁদ সূর্যের আলো ঢেকে দেয় এবং পৃথিবীর কিছু অংশে সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। এটি সাধারণত অমাবস্যার সময় ঘটে।

অন্যদিকে চন্দ্রগ্রহণ (Lunar Eclipses) ঘটে পূর্ণিমার সময়, যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান নেয়। তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে এবং চাঁদ ধীরে ধীরে ম্লান বা অন্ধকার দেখায়। গ্রহণ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি নির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে এবং সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের কক্ষপথ ও গতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই গ্রহণ আমাদের মহাকাশের গতি, আলো ও ছায়ার আচরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।

| পৃথিবীর ছায়া (Earth’s Shadow) |
পৃথিবীর ছায়া (Earth’s Shadow) বলতে বোঝায় সেই অন্ধকার অংশ, যা পৃথিবী সূর্যের আলো আটকে দিলে মহাকাশে তৈরি হয়। সূর্য একটি শক্তিশালী আলোর উৎস, আর পৃথিবী যখন সেই আলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন পৃথিবীর পেছনের দিকে একটি ছায়া পড়ে। এই ছায়াই পৃথিবীর ছায়া নামে পরিচিত।
পৃথিবীর ছায়া মূলত দুই ভাগে বিভক্ত
- প্রথমটি হলো উম্ব্রা (Umbra)। এটি ছায়ার সবচেয়ে ভেতরের ও গাঢ় অংশ, যেখানে সূর্যের আলো একেবারেই পৌঁছায় না। কোনো বস্তু যদি এই অংশে প্রবেশ করে, তবে সেটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢেকে যায়।
- দ্বিতীয় অংশটি হলো পেনাম্ব্রা (Penumbra)। এটি উম্ব্রার চারপাশের হালকা ছায়া অঞ্চল। এখানে সূর্যের আলো আংশিকভাবে পৌঁছায়, তাই আলো পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
পৃথিবীর ছায়া সম্পর্কে জানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো চন্দ্রগ্রহণ। পূর্ণিমার সময় চাঁদ যদি পৃথিবীর উম্ব্রা বা পেনাম্ব্রার ভেতর দিয়ে যায়, তখন চাঁদের ওপর পৃথিবীর ছায়া পড়ে এবং চন্দ্রগ্রহণ ঘটে। এইভাবে পৃথিবীর ছায়া সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
| চন্দ্রগ্রহণ (Lunar Eclipses) |
চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবীর ছায়ার ভেতরে প্রবেশ করে (চিত্র দেখুন)। এই সময় পৃথিবী সূর্যের আলোকে চাঁদের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। তখন চাঁদ থাকে পূর্ণিমা অবস্থায় (Full Moon)।
| চন্দ্রগ্রহণের ধরন |
চন্দ্রগ্রহণের ধরন বলতে বোঝায়, পূর্ণিমার সময় চাঁদ পৃথিবীর ছায়ার কোন অংশ দিয়ে অতিক্রম করছে তার ওপর ভিত্তি করে চন্দ্রগ্রহণকে যে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়।

পৃথিবীর ছায়ার গঠন অনুযায়ী চন্দ্রগ্রহণ মূলত তিন ধরনের
- প্রথমটি হলো পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ (Total Lunar Eclipse)। এতে চাঁদ পুরোপুরি পৃথিবীর উম্ব্রা বা গাঢ় ছায়ার ভেতরে প্রবেশ করে। এই সময় চাঁদ উজ্জ্বল সাদা না থেকে লালচে বা তামাটে রঙের দেখায়। কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দিয়ে বেঁকে আসা সূর্যের কিছু আলো চাঁদের ওপর পড়ে।
- দ্বিতীয়টি হলো আংশিক চন্দ্রগ্রহণ (Partial Lunar Eclipse) । এ ক্ষেত্রে চাঁদের একটি অংশ পৃথিবীর উম্ব্রার ভেতরে যায়, আর বাকি অংশ বাইরে থাকে। ফলে চাঁদের এক পাশ অন্ধকার দেখায় এবং অন্য পাশ উজ্জ্বল থাকে।
- তৃতীয়টি হলো উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ/ পেনামব্রাল চন্দ্রগ্রহণ (Penumbral Lunar Eclipse)। এতে চাঁদ পৃথিবীর পেনাম্ব্রা বা হালকা ছায়ার ভেতর দিয়ে যায়। এই ধরনের চন্দ্রগ্রহণে চাঁদের উজ্জ্বলতা সামান্য কমে, কিন্তু খালি চোখে পরিবর্তন অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়।
এই তিন ধরনের চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর ছায়া ও চাঁদের অবস্থানের পার্থক্যের কারণে ঘটে এবং প্রতিটি ধরন আমাদের আলো ও ছায়ার আচরণ সম্পর্কে আলাদা ধারণা দেয়। কখনো কখনো এমনও হয়, যখন চাঁদ পৃথিবীর পেনামব্রা ছায়ার মধ্যেও প্রবেশ করে না। তখন আমরা একটি স্বাভাবিক পূর্ণিমা চাঁদই দেখি।
নোট:
পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে যারা চাঁদ দেখতে পারেন, তারা চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পারবেন, গ্রহণটি যেকোনো ধরনেরই হোক না কেন। এমনকি আপনি যদি মহাকাশের অন্য কোথাও থাকেন এবং চাঁদ দেখতে পারেন, তাহলেও আপনি চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পাবেন।
নোট:
পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ সাধারণত কালো হয়ে যায় না বা অদৃশ্য হয়ে যায় না। বেশিরভাগ সময় এটি লালচে রঙের হয়ে যায়। এর কারণ হলো, সূর্যের লাল আলো সরাসরি চাঁদের কাছে না পৌঁছালেও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে বাঁক নিয়ে পরোক্ষভাবে চাঁদের কাছে পৌঁছে যায়।
| ডানজন স্কেল (The Danjon Scale) |
| সূর্যগ্রহণ (Solar Eclipses) |
| সূর্যগ্রহণের ধরন |

- প্রথমটি হলো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ (Total Solar Eclipse)। এ ক্ষেত্রে চাঁদ সম্পূর্ণভাবে সূর্যের সামনে চলে আসে এবং সূর্যের পুরো চাকতি ঢেকে যায়। তখন দিনের বেলায় কিছু সময়ের জন্য অন্ধকার নেমে আসে এবং সূর্যের চারপাশে আলোর বলয় বা করোনাও দেখা যেতে পারে।
- দ্বিতীয়টি হলো আংশিক সূর্যগ্রহণ (Partial Solar Eclipse)। এতে চাঁদ সূর্যের কেবল একটি অংশ ঢেকে দেয়। ফলে সূর্যের বাকি অংশ দৃশ্যমান থাকে এবং আলো পুরোপুরি বন্ধ হয় না। পৃথিবীর সব জায়গা থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যায় না, কিন্তু আংশিক সূর্যগ্রহণ অনেক বিস্তৃত এলাকায় দেখা যেতে পারে।
- তৃতীয়টি হলো বলয়াকার সূর্যগ্রহণ (Annular Solar Eclipse)। এই ধরনের গ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ সূর্যের সামনে এলেও আকারে তুলনামূলকভাবে ছোট দেখায়। তখন সূর্যের মাঝখানের অংশ ঢাকা পড়ে, কিন্তু চারপাশে উজ্জ্বল একটি আলোর বলয় রয়ে যায়। এই কারণেই একে বলয়াকার সূর্যগ্রহণ বলা হয়।
- চতুর্থটি হলো হাইব্রিড সূর্যগ্রহণ। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল। পৃথিবীর কিছু স্থানে এটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণের মতো দেখা যায়, আবার কিছু স্থানে বলয়াকার সূর্যগ্রহণের মতো দেখা দেয়। পর্যবেক্ষণস্থানের ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর এর ধরন পরিবর্তিত হয়।
| পূর্ণ সূর্যগ্রহণ: সাম্প্রতিক ও নিকট ভবিষ্যৎ |

| নিখুঁত সরলরেখায় অবস্থান (Perfect Alignment) |
- একটিকে বলা হয় উর্ধ্বগামী নোড (Ascending Node)। এখানে চাঁদ পৃথিবীর কক্ষপথের সমতলের নিচ দিক থেকে উপরের দিকে উঠে আসে।
- অন্যটি হলো অধোগামী নোড (Descending Node)। এখানে চাঁদ উপরের দিক থেকে নিচের দিকে নেমে যায়।লুনার নোড গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

| “চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন” |