News & Articles
You will get the latest news about Astronomy
2026 February 1
1 views

মহাকাশে সবকিছুই চলমান।
মহাবিশ্বে স্থির কিছুই নেই । আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (Special Theory of Relativity) আমাদের একটি মৌলিক ধারণা দেয়—মহাবিশ্বে রেফারেন্সের কোনো পরম বা চূড়ান্ত ফ্রেম নেই। অর্থাৎ, “সম্পূর্ণ স্থির” এমন কোনো অবস্থান মহাবিশ্বে বাস্তবে নেই। আপনি আপনার নিজস্ব রেফারেন্স ফ্রেম থেকে অন্য বস্তুর গতি নির্ণয় করতে পারেন, কিন্তু সেই রেফারেন্স ফ্রেম অন্য যেকোনো রেফারেন্স ফ্রেমের চেয়ে বেশি সত্য বা নির্ভুল নয়। এই ধারণা সরাসরি আমাদের পৃথিবীর গতির বিষয়টিতে এসে পৌঁছায়।

শুরুর দিকে মানুষ মনে করত পৃথিবীই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। কারণ, আমাদের মনে হতো আমরা নড়ছি না, বরং সূর্য, চাঁদ ও তারা আমাদের চারপাশে ঘুরছে। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।

কেন আমরা পৃথিবীর গতি অনুভব করি না?

আমরা প্রতিদিনই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই—পৃথিবী এত দ্রুত ঘুরছে এবং সূর্যের চারদিকে ছুটে চলেছে, তবু আমরা কেন এর গতি অনুভব করি না? বিষয়টি শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে আছে সহজ ও পরিষ্কার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। প্রথম কারণ হলো সমান বা ধ্রুব গতি। পৃথিবী নিজ অক্ষে এবং সূর্যের চারদিকে প্রায় সমান গতিতে ঘোরে। যখন কোনো বস্তু সমান গতিতে চলে, তখন ভেতরে থাকা বস্তু বা মানুষ সেই গতি আলাদা করে অনুভব করে না। আমরা আসলে গতি নয়, অনুভব করি গতির পরিবর্তন বা ত্বরণ। এটা বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। 

ধরুন আপনি বিমানে ৩৫,০০০ ফুট উচ্চতায় ঘণ্টায় ৫৫০ মাইল বেগে উড়ছে। যদি কোনো ঝাঁকুনি না থাকে এবং জানালার ছায়া বন্ধ থাকে, তবে বিমানের ভেতরে বসে আমরা সেই গতি অনুভব করব না। আমাদের কাছে মনে হবে আমরা স্থির আছি। কিন্তু টেক-অফ বা ল্যান্ডিংয়ের সময় আমরা বেগের পরিবর্তন অনুভব করি,কারণ গতির পরিবর্তন ঘটছে। তখন ত্বরণ (acceleration) বা হ্রাস (deceleration) ঘটে। পৃথিবীর ক্ষেত্রে এমন হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে না।

দ্বিতীয় কারণ হলো আমরা ও আমাদের চারপাশের সবকিছু একসঙ্গে চলছি। পৃথিবীর সঙ্গে আমরা, বায়ুমণ্ডল, সমুদ্র, পাহাড়—সবকিছুই একই গতিতে ঘুরছে। তাই আমাদের শরীরের ভেতরে আলাদা করে কোনো আপেক্ষিক গতি তৈরি হয় না, যেটা অনুভব করা সম্ভব। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাধ্যাকর্ষণ। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ আমাদের শক্তভাবে ধরে রাখে। তাই পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে আমরা ছিটকে যাই না বা আলাদা কোনো টান অনুভব করি না।

সংক্ষেপে বলা যায়, আমরা পৃথিবীর গতি অনুভব করি না কারণ পৃথিবী প্রায় সমান গতিতে চলে, আমরা সেই গতির অংশ হয়ে যাই, এবং আমাদের চারপাশের সবকিছু একইভাবে একসঙ্গে চলছে। ঠিক যেমন মসৃণভাবে চলা একটি জাহাজের ভেতরে বসে থাকলে নিজের চলার অনুভূতি হয় না, পৃথিবীর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই।  ঠিক একই কারণে পৃথিবীর অনেক গতি আমরা অনুভব করি না, কারণ সেগুলো প্রায় ধ্রুব গতিতে চলছে।

পৃথিবীর প্রধান গতিসমূহ

পৃথিবীর আবর্তন (Earth’s Rotation)
  • গতি:প্রায় ১,৬৭০ কিমি/ঘণ্টা (বিষুবরেখায়)
  • ব্যাখ্যা: পৃথিবী নিজ অক্ষে ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘোরে।মেরুর দিকে গেলে এই গতি ধীরে ধীরে শূন্যে নেমে আসে।

পৃথিবীর আবর্তন (Earth’s Rotation) বলতে বোঝায় পৃথিবীর নিজের অক্ষের ওপর ঘূর্ণন। পৃথিবী পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে এবং একবার সম্পূর্ণ ঘুরতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। এই আবর্তনের ফলেই আমাদের কাছে দিন ও রাতের পরিবর্তন ঘটে। যখন পৃথিবীর কোনো অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, তখন সেখানে দিন হয়। আবার পৃথিবী ঘুরে সেই অংশ সূর্যের বিপরীত দিকে চলে গেলে সেখানে রাত নেমে আসে। এভাবে পৃথিবীর অবিরাম আবর্তনের কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আলোর সময় ও অন্ধকারের সময় আলাদা হয়।

একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ধরুন একটি গোল বলের ওপর একটি আলো ফেললেন এবং বলটি আস্তে আস্তে ঘোরাতে শুরু করলেন। যে অংশ আলোয়ের দিকে থাকবে, সেটি আলোকিত থাকবে, আর বিপরীত দিক অন্ধকারে থাকবে। বল ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে আলোকিত অংশ ও অন্ধকার অংশও বদলে যাবে।

পৃথিবীর আবর্তন ঠিক এইভাবেই দিন ও রাত সৃষ্টি করে। পৃথিবীর আবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো সময়ের পার্থক্য বা সময় অঞ্চল (Time Zone)। যেহেতু পৃথিবী ঘুরছে, তাই পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন দিন, অন্য প্রান্তে তখন রাত। এই কারণেই বিভিন্ন দেশে সময় আলাদা হয়। এছাড়া পৃথিবীর আবর্তনের ফলে বায়ু প্রবাহ ও সমুদ্র স্রোতের দিকও প্রভাবিত হয়, যাকে কোরিওলিস প্রভাব বলা হয়। আবহাওয়া ও জলবায়ু বোঝার ক্ষেত্রেও পৃথিবীর আবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সংক্ষেপে বলা যায়, পৃথিবীর আবর্তন একটি মৌলিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার ফলে দিন-রাতের সৃষ্টি, সময়ের পার্থক্য এবং আবহাওয়ার নানা পরিবর্তন ঘটে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ অনেকটাই পৃথিবীর এই আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল।

পৃথিবীর বিপ্লব (Earth’s Revolution)
  • গতি:প্রায় ১,০৭,০০০ কিমি/ঘণ্টা
  • ব্যাখ্যা: পৃথিবী সূর্যের চারদিকে বছরে একবার প্রদক্ষিণ করে।

পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে চলে। সূর্যের চারদিকে এই সম্পূর্ণ একবার ঘুরে আসার গতিকেই পৃথিবীর বিপ্লব বলা হয়। পৃথিবী প্রতি বছরে একবার সূর্যের চারদিকে সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করে, যা সম্পন্ন হতে প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। এই অতিরিক্ত ৬ ঘণ্টার কারণেই প্রতি চার বছরে একবার অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার হয়।

পৃথিবীর বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো ঋতু পরিবর্তন। পৃথিবীর অক্ষ প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকার কারণে, সূর্যের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ সূর্যালোক বেশি বা কম পায়। এর ফলেই কখনও গ্রীষ্ম, কখনও শীত, আবার কখনও বর্ষা বা বসন্তের মতো ভিন্ন ভিন্ন ঋতু দেখা যায়।

উদাহরণ: যখন পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে কিছুটা ঝুঁকে থাকে, তখন সেখানে সূর্যের আলো বেশি পড়ে এবং গ্রীষ্মকাল হয়। একই সময়ে দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যের আলো কম পড়ে, তাই সেখানে শীতকাল দেখা যায়। আবার ছয় মাস পরে পরিস্থিতি উল্টো হয়। এইভাবে পৃথিবীর বিপ্লবের কারণেই আমাদের বছরে নিয়মিতভাবে ঋতুর পরিবর্তন ঘটে।

প্রিসেশন (Precession) 
  • গতি (সময়কাল দিয়ে মাপা হয়): এক পূর্ণ চক্র সম্পন্ন করতে প্রায় ২৬,০০০ বছর 
  • কৌণিক গতি: প্রায় ০.০১৪ ডিগ্রি প্রতি বছর 
  • ব্যাখ্যা: এটি খুব ধীর গতি, তাই কিমি/ঘণ্টায় বোঝানো বাস্তবসম্মত নয়।

পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ স্থির নয়। সময়ের সাথে সাথে এটি ধীরে ধীরে দিক পরিবর্তন করে একটি বৃত্তাকার পথে ঘোরে। পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের এই ধীর বৃত্তাকার গতিকেই প্রিসেশন বলা হয়। প্রায় প্রতি ২৬,০০০ বছরে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষ একটি পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন করে। এই প্রিসেশন গতির কৌণিক ব্যাসার্ধ প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি। অর্থাৎ পৃথিবীর অক্ষ যেদিকে হেলে আছে, সেই হেলনের দিক ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। তবে অক্ষের হেলন নিজে খুব বেশি পরিবর্তিত হয় না, শুধু তার দিক ঘুরে যায়।

এই গতিকে সহজে বোঝা যায় একটি ঘুরতে থাকা লাটিমের উদাহরণ দিয়ে। লাটিম দ্রুত ঘুরতে থাকলে তার অক্ষ সোজা থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটি টলমল করতে করতে বৃত্তাকার পথে ঘোরে। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও অনেকটা একই রকম ঘটনা ঘটে, তবে এটি অত্যন্ত ধীর গতিতে হয় এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে প্রভাব ফেলে।

প্রিসেশনের ফলে দীর্ঘ সময়ে নক্ষত্রের অবস্থান বদলে যায় এবং আকাশে ধ্রুবতারা পরিবর্তিত হয়। এছাড়া এটি পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথেও সম্পর্কিত।

নিউটেশন (Nutation)
  • গতি / সময়কাল: প্রধান নিউটেশন চক্র প্রায় ১৮.৬ বছর 
  • ব্যাখ্যা: এটি প্রিসেশনের উপর ছোট দোলন, তাই এর গতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম।

নিউটেশন হলো পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু নিয়মিত দোলন বা কাঁপুনি। পৃথিবীর অক্ষ যখন প্রিসেশনের কারণে ধীরে ধীরে বৃত্তাকার পথে ঘোরে, তখন সেই গতির উপর ছোট ছোট ওঠানামা যুক্ত হয়। এই অতিরিক্ত দোলনকেই নিউটেশন বলা হয়।

নিউটেশনের মূল কারণ হলো চাঁদ এবং সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। বিশেষ করে চাঁদের প্রভাব এতে বেশি দেখা যায়। চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের সাথে পুরোপুরি সমতল না হওয়ায়, পৃথিবীর অক্ষের উপর তার টান সব সময় সমান থাকে না। এর ফলেই অক্ষ সামান্য সামনে–পেছনে বা উপরে–নিচে দুলতে থাকে।

এই গতিকে সহজভাবে বোঝা যায় একটি ঘুরতে থাকা লাটিমের উদাহরণ দিয়ে। লাটিম ঘুরতে ঘুরতে শুধু বৃত্তাকার পথে টলমল করে না, বরং মাঝে মাঝে ছোট ছোট কাঁপুনি দেখায়। পৃথিবীর ক্ষেত্রে প্রিসেশন হলো বড় টলমল করা গতি, আর নিউটেশন হলো তার উপর বসে থাকা ছোট কাঁপুনি।

নিউটেশনের সময়কাল সাধারণত কয়েক বছর থেকে প্রায় ১৮.৬ বছর পর্যন্ত হতে পারে। যদিও এই প্রভাব খুবই সূক্ষ্ম, তবুও জ্যোতির্বিদ্যা, ক্যালেন্ডার গণনা এবং পৃথিবীর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয়ে নিউটেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

 গ্যালাকটিক ঘূর্ণন (Galactic Rotation)
  • সূর্যের গতি (Milky Way–এর কেন্দ্রের চারদিকে): প্রায় ৮২০,০০০ কিমি/ঘণ্টা 
  • সময়কাল:একবার ঘুরতে প্রায় ২২৫–২৫০ মিলিয়ন বছর 
  • একে বলা হয়: এক গ্যালাকটিক বছর

গ্যালাকটিক ঘূর্ণন বলতে একটি গ্যালাক্সির ভেতরে থাকা নক্ষত্র, গ্রহমালা, গ্যাস ও ধূলিকণার কেন্দ্রের চারদিকে ঘুরে চলার গতিকে বোঝায়। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেও এই ঘূর্ণন ঘটে। এখানে অধিকাংশ নক্ষত্র গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা ঘন ও ভরযুক্ত অঞ্চলের চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করে।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারদিকে এই ঘূর্ণন ঘটে মূলত মহাকর্ষীয় আকর্ষণের কারণে। তবে এই গতি শুধু দৃশ্যমান পদার্থ দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। গ্যালাকটিক ঘূর্ণনের গতি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পান, কারণ গ্যালাক্সির বাইরের অংশের নক্ষত্রগুলো প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বেগে ঘোরে।

আমাদের সূর্যও মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি বাহুতে অবস্থান করে এবং গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারদিকে ঘুরছে। সূর্যকে একবার পুরো ঘূর্ণন সম্পন্ন করতে প্রায় ২২৫ থেকে ২৫০ মিলিয়ন বছর সময় লাগে, যাকে এক গ্যালাকটিক বছর বলা হয়।

সহজভাবে বলা যায়, যেমন গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তেমনি গ্যালাক্সির ভেতরের নক্ষত্রগুলো গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারদিকে ঘোরে। এই গ্যালাকটিক ঘূর্ণন গ্যালাক্সির গঠন, স্থায়িত্ব এবং বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূর্যের অরবিটাল দোলন (Solar Oscillation)
  • গতি:কয়েক হাজার কিমি/ঘণ্টার মধ্যে (নির্দিষ্ট একক গতি নয়)
  • সময়কাল:প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর 
  • ব্যাখ্যা:সূর্য সৌরজগতের ব্যারিসেন্টারের চারদিকে দোলনের মতো চলে।

সূর্যকে আমরা সাধারণত স্থির মনে করি, কিন্তু বাস্তবে সূর্য পুরোপুরি স্থির নয়। সূর্য ও সৌরজগতের সব গ্রহ একসাথে একটি সাধারণ ভরকেন্দ্রের চারদিকে ঘোরে, যাকে ব্যারিসেন্টার বলা হয়। গ্রহগুলোর মহাকর্ষীয় টানের কারণে সূর্য এই ভরকেন্দ্রের চারদিকে সামান্য দোলনের মতো গতিতে চলতে থাকে। সূর্যের এই গতিকেই সূর্যের অরবিটাল দোলন বা Solar Oscillation বলা হয়।

বিশেষ করে বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের মতো বিশাল ভরযুক্ত গ্রহগুলো সূর্যের উপর বেশি প্রভাব ফেলে। তাদের টানের ফলে সূর্য কখনও ব্যারিসেন্টারের একদিকে সরে যায়, আবার কখনও অন্যদিকে। ফলে সূর্যের গতি একেবারে সরল নয়, বরং সামান্য টলমল বা দোলনযুক্ত। এই দোলনের সময়কাল প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর

ই দোলনকে সহজভাবে বোঝা যায় একটি উদাহরণ দিয়ে। ধরো, একজন শক্তিশালী মানুষ ও একজন অপেক্ষাকৃত হালকা মানুষ একে অপরের হাত ধরে ঘুরছে। শক্তিশালী মানুষটি তুলনামূলকভাবে কম নড়াচড়া করলেও পুরোপুরি স্থির থাকে না। সূর্য ও গ্রহগুলোর ক্ষেত্রেও অনেকটা এমনই ঘটনা ঘটে।

সূর্যের অরবিটাল দোলন সৌরজগতের গতিবিধি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সূর্যের অবস্থান, গ্রহের কক্ষপথের সূক্ষ্ম পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি সৌরগত গতিশীলতা বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করে।

গ্যালাকটিক আকর্ষণ (Galactic Attraction) 
  • (Milky Way ↔ Andromeda) 
  • আপেক্ষিক গতি: প্রায় ২৫০,০০০ মাইল/ঘণ্টা ≈ ৪০২,০০০ কিমি/ঘণ্টা 
  • ব্যাখ্যা: এটি আপেক্ষিক গতি। অ্যান্ড্রোমিডার দৃষ্টিতে মিল্কিওয়েই একই গতিতে এগোচ্ছে।
গ্যালাকটিক আকর্ষণ হলো একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় ভরের দিকে তার ভেতরের নক্ষত্র, গ্যাস, ধূলিকণা এবং গ্রহমালার ঘূর্ণন বা পতনের প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। এটি মূলত মহাকর্ষীয় শক্তির কারণে ঘটে। গ্যালাক্সির প্রতিটি অংশ অন্য অংশের ভরের দ্বারা টানা হয়, ফলে নক্ষত্র ও অন্যান্য পদার্থ গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘূর্ণন করে।

উদাহরণ: আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্র গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল এবং ভরের ঘনত্বের চারপাশে ঘুরছে। সূর্যকে সম্পূর্ণ একটি কক্ষপথে ঘুরতে প্রায় ২২৫ থেকে ২৫০ মিলিয়ন বছর সময় লাগে। গ্যালাকটিক আকর্ষণের কারণে সূর্য এবং আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য অংশের গড় ঘূর্ণনগতিবেগ প্রায় ৮২০,০০০ কিমি/ঘণ্টা (প্রায় ৫১০,০০০ মাইল/ঘণ্টা)।

গ্যালাক্সিগুলোও একে অপরের সাপেক্ষে গতিশীল।অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি প্রায় 250,000 মাইল প্রতি ঘন্টা গতিতে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কাছে আসছে। যেহেতু রেফারেন্সের কোনো নিখুঁত ফ্রেম নেই, এর মানে হল যে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির প্রাণীদের কাছে, আমরা তাদের কাছে 250,000 মাইল প্রতি ঘণ্টায় পৌঁছে যাচ্ছি। রেফারেন্স ফ্রেম যেহেতু আপেক্ষিক, তাই অ্যান্ড্রোমিডার দৃষ্টিতে আমরাই তাদের দিকে একই গতিতে এগিয়ে যাচ্ছি।

সহজভাবে বলা যায়, গ্যালাকটিক আকর্ষণের কারণে গ্যালাক্সিগুলো ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে এগোচ্ছে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংযোগ বা সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটি দেখায় যে মহাবিশ্বও ধীরগতিতে গতিশীল এবং একেবারে স্থির নয়।

পৃথিবীতে অবস্থান (Location on Earth)
পৃথিবীতে একজন পর্যবেক্ষকের অবস্থান, বিশেষ করে তার অক্ষাংশ, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এবং দিন–রাত্রির দৈর্ঘ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করে। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একই সময়ে সূর্যের অবস্থান একরকম হয় না, কারণ পৃথিবী গোলাকার এবং এর অক্ষ কাত হয়ে আছে।
পৃথিবীর বিষুবরেখার কাছাকাছি এলাকায় সারা বছর দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য খুব সামান্যই পরিবর্তিত হয়। এখানে প্রায় সারা বছরই দিন ও রাত প্রায় সমান সময়ের হয়। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে গেলে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন হয়। পৃথিবীর অক্ষ কাত হয়ে থাকার কারণে এবং সূর্যের চারপাশে কক্ষপথে আবর্তনের ফলে সেখানে দিন–রাত্রির চক্র খুবই চরম রূপ নেয়।

মেরু অঞ্চলে এমন সময় আসে যখন টানা অনেক দিন সূর্য অস্ত যায় না। এই ঘটনাকে বলা হয় মধ্যরাতের সূর্য বা Midnight Sun। আবার বছরের অন্য সময় সেখানে টানা অনেক দিন সূর্য ওঠেই না, যাকে মেরু রাত্রি বলা হয়। এই সব ভিন্নতার মূল কারণ হলো পৃথিবীর কাত হওয়া ঘূর্ণন অক্ষ এবং সূর্যকে কেন্দ্র করে তার পরিক্রমণ। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আলো, সময় এবং ঋতুর এমন বৈচিত্র্য দেখা যায়।

এক নজরে সারাংশ (Quick Table)

গতিআনুমানিক স্পিড
Earth’s Rotation 1,670 km/h
Earth’s Revolution 107,000 km/h
Precession 26,000 বছরে ১ চক্র
Nutation 18.6 বছর চক্র
Galactic Rotation 820,000 km/h
Solar Oscillation ~35 মিলিয়ন বছর চক্র
Galactic Attraction 402,000 km/h

উপরের তালিকাগুলো ছাড়াও পৃথিবী, সূর্য এবং আমাদের গ্যালাক্সির সাথে জড়িত আরও অসংখ্য সূক্ষ্ম ও জটিল গতি রয়েছে। আমরা যেহেতু এই গতিগুলোর সাথে একসাথেই চলছি, তাই পৃথিবীতে বসবাস করে সেগুলো সরাসরি অনুভব করি না। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব গতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলোর মাধ্যমেই মহাবিশ্বের কাঠামো ও আচরণ বোঝা যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়
  • পৃথিবী নিজ অক্ষে ঘোরে প্রায় ১,৬৭০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে (বিষুবরেখায়)।
  • পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে প্রায় ১,০৭,০০০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে।
  • সূর্য মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের চারদিকে ঘোরে প্রায় ৮২০,০০০ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে।
  • মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি নিজেও পার্শ্ববর্তী গ্যালাক্সিগুলোর সাপেক্ষে কয়েক লক্ষ কিমি প্রতি ঘণ্টা বেগে চলমান।
এছাড়াও আছে অক্ষের প্রিসেশন, নিউটেশন, সৌরজগতের ব্যারিসেন্টারের চারপাশে সূর্যের দোলন, গ্যালাক্সির অভ্যন্তরীণ নক্ষত্রগত গতি এবং গ্যালাক্সিগুলোর পারস্পরিক আকর্ষণজনিত গতি। এসব গতির অনেকটাই খুব ধীর, আবার কিছু গতি অত্যন্ত দ্রুত হলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে তা অনুভূত হয় না।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আমরা আপাতদৃষ্টিতে স্থির মনে হলেও বাস্তবে পৃথিবীসহ আমরা সবাই একসাথে বহু স্তরের গতির ভেতর দিয়ে মহাবিশ্বে ছুটে চলেছি। এই বাস্তবতাই মহাবিশ্বকে করে তোলে আরও বিস্ময়কর ও গভীরভাবে অনুসন্ধানযোগ্য।

শেষ কথা
মহাকাশে আসলে কিছুই স্থির নয়। পৃথিবী ঘুরছে, সূর্য চলমান, গ্যালাক্সি একে অপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—সবকিছুই গতিশীল। আমরা অনুভব করি না বলে এই গতিগুলো ছোট নয়। বাস্তবে আমরা এই মুহূর্তে একসাথে বহু লক্ষ কিমি/ঘণ্টা বেগে মহাবিশ্বে ছুটছি—শুধু সবকিছু যেহেতু একসাথে চলছে, তাই তা আমাদের কাছে অদৃশ্য।

আমরা যেহেতু এই গতিগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি এবং সেগুলো প্রায় ধ্রুব, তাই আমাদের কাছে মনে হয় আমরা স্থির। কিন্তু বাস্তবে আমরা এক অবিশ্বাস্য গতিশীল মহাবিশ্বের অংশ। এই উপলব্ধিই জ্যোতির্বিজ্ঞানকে আরও বিস্ময়কর ও গভীর করে তোলে।


তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট 


নিবন্ধ: এফ. রহমান