কেন চাঁদের আকৃতি পরিবর্তন হতে দেখি? কেন চাঁদ রাতের পর রাত অর্ধচন্দ্রাকার থেকে গিব্বাস হয়ে আবার ফিরে আসে |
চাঁদ পৃথিবী থেকে গড়ে ৩৮৪,৪০০ কিমি দূরে অবস্থিত এবং এটি খালি চোখে, দূরবীন অথবা ছোট একটি টেলিস্কোপের মাধ্যমে দেখতে অত্যাশ্চর্য ও দর্শনীয় একটি মহাকাশীয় বস্তু। অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফারদের জন্যও এটি একটি দুর্দান্ত লক্ষ্য।

চাঁদকে দেখে শান্ত মনে হয়,কিন্তু বাস্তবে এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩,৬৮২ কিমি বেগে পূর্ব দিকে যাত্রা করছে। যেহেতু এর কক্ষপথ প্রায় বৃত্তাকার এবং পৃথিবীর তুলনায় মাত্র ৫° কাত হয়ে আছে, তাই এটি কমবেশি আকাশ জুড়ে গ্রহন বা সূর্যের আপাত পথ অনুসরণ করে।
আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে চাঁদ সবসময় আমাদের দিকে একই মুখ করে থাকে। কারণ এটি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে ঠিক একই সময়ে নিজের অক্ষের উপর একবার ঘোরে, যা সম্পন্ন হয় ২৭ দিন ও ৭ ঘণ্টায়। এই সিঙ্ক্রোনাইজেশনকে বলা হয় জোয়ার-ভাটা লকিং। এটি পৃথিবীর মহাকর্ষীয় প্রভাবের ফলে তৈরি হয়েছে, যখন চাঁদ বয়সে তরুণ ছিল। চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথে যাত্রার সময়, এটি বিভিন্ন ‘পর্যায়ের’ মধ্য দিয়ে যায়।
প্রকৃতপক্ষে চাঁদের অর্ধেক অংশ সবসময়ই আলোকিত থাকে। আমরা সেটিকে পুরোটা দেখতে পাই না, কারণ বিপরীত আলোকিত অংশটি চাঁদের দূরের দিকে অবস্থান করে। এবং যখন আমরা চাঁদের পৃষ্ঠে আলো ও অন্ধকারের সীমারেখা বা টার্মিনেটর ডান থেকে বামে চলতে দেখি, তখন আসলে দুটি টার্মিনেটর সক্রিয় থাকে। একটি হলো সকালের টার্মিনেটর, যা চন্দ্র দিনের সূচনা করে এবং আরেকটি হলো সন্ধ্যার টার্মিনেটর, যা রাতকে ফিরিয়ে আনে। তাই চাঁদের কোনো স্থায়ী অন্ধকার দিক নেই।
| চাঁদের পর্যায় (Phase of the Moon) |
অনেকে যা বুঝতে পারে না, যদিও এটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক, তা হলো চাঁদের পর্যায় এবং চন্দ্রোদয়ের সময়ের মধ্যেও একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

| নতুন চাঁদ (New Moon) |

নতুন চাঁদ (১% দৃশ্যমানতা)
এই পর্যায়ে পৃথিবীর একই দিকে সূর্য ও চাঁদ অবস্থান করে। তারা একসঙ্গে উদিত হয়, কিন্তু আমরা চাঁদকে দেখতে পারি না কারণ এটি সূর্যের আলোতে ঢাকা থাকে। এই সময় চাঁদের আমাদের দিকের মুখ সম্পূর্ণ ছায়ায় থাকে।
| ওয়াক্সিং ক্রিসেন্ট (Waxing Crescent Moon) |

চাঁদ তার কক্ষপথে যাত্রা অব্যাহত রাখে এবং সূর্যালোক চাঁদের পশ্চিম (ডান) প্রান্তে পড়তে শুরু করে। এতে একটি পাতলা ক্রিসেন্ট তৈরি হয়। সকালের টার্মিনেটর পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রায় ১৫.৫ কিমি/ঘন্টা বেগে অগ্রসর হয়।
| প্রথম চতুর্থাংশ (First Quarter Moon) |

এটি অনেককে বিভ্রান্ত করে, কারণ এটি দেখতে অর্ধেক চাঁদের মতো হলেও একে চতুর্থাংশ বলা হয়। কারণ টার্মিনেটর চাঁদের চারপাশে তার ৩৬০° যাত্রার এক চতুর্থাংশ বা ৯০° অতিক্রম করেছে। এই পর্যায়ে চাঁদ দুপুরে উদিত হয় এবং মধ্যরাতে অস্ত যায়। টার্মিনেটর বরাবর সূর্যালোক কম কোণে পড়ায় দীর্ঘ ছায়া তৈরি হয়, যা গর্ত ও পর্বতগুলোকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। ফলে এটি চন্দ্র পর্যবেক্ষণের জন্য আদর্শ সময়।
| ওয়াক্সিং স্ফীত (Waxing Gibbous Moon) |

এই পর্যায়ে চাঁদ প্রায় সম্পূর্ণ আলোকিত হয়। আলোকিত অংশটি ডিমের মতো স্ফীত আকৃতি ধারণ করে এবং প্রতিদিন আকারে বৃদ্ধি পায়।
| পূর্ণিমা (Full Moon) |

পূর্ণিমায় চাঁদ সূর্য থেকে পৃথিবীর ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থান করে। এর কাছের দিক সম্পূর্ণরূপে আলোকিত থাকে। এই সময় চাঁদের পৃষ্ঠ ছায়াহীন ও সমতল দেখায়, যা পর্যবেক্ষণের জন্য খুব উপযোগী নয়। এই পর্যায়ে সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে চাঁদ উদিত হয় এবং সূর্য উদিত হওয়ার সময় চাঁদ অস্ত যায়। ফলে সারা রাত চাঁদ দৃশ্যমান থাকে।
| ক্ষীয়মাণ স্ফীত (Waning Gibbous Moon) |

এই পর্যায়ে চাঁদের পশ্চিম প্রান্ত ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যায়। সূর্যালোকিত ডিমের মতো অংশটি কমতে শুরু করে।
| শেষ চতুর্থাংশ (Third Quarter Moon) |

পূর্ণিমার প্রায় ৭ দিন ৯ ঘণ্টা পর এই পর্যায় আসে। চাঁদ সূর্যের ৯০° পশ্চিমে অবস্থান করে এবং পূর্ব প্রান্ত অর্ধেক আলোকিত থাকে। এই পর্যায়ে চাঁদ মধ্যরাতে ওঠে এবং দুপুরে অস্ত যায়।
| ক্ষীয়মাণ ক্রিসেন্ট (Waning Crescent Moon) |

এই পর্যায়ে শুধুমাত্র পূর্ব প্রান্তে সূর্যালোক পড়ায় একটি সুন্দর ‘সি’ আকৃতির ক্রিসেন্ট দেখা যায়। চন্দ্রচক্রের সমাপ্তির দিকে এটি প্রতিদিন ছোট হতে থাকে এবং নতুন চাঁদের দিকে ফিরে যায়। যদিও চাঁদের একই মুখ সবসময় আমাদের দিকে থাকে, তবুও প্রতিদিনের এই পরিবর্তন চাঁদ পর্যবেক্ষণকে এক অনন্য আনন্দে পরিণত করে।

ছবি: চাঁদের পর্যায়গুলি
| লুনার লিব্রেশন |
চন্দ্র লিব্রেশনের কারণে আমরা চাঁদের পৃষ্ঠের অর্ধেকের কিছু বেশি অংশ পর্যবেক্ষণ করতে পারি। একটি চন্দ্র চক্রে চাঁদ একই সাথে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে দোল খায়। এই দোলনকেই লিব্রেশন বলা হয়।

| অক্ষাংশে লিব্রেশন |
চাঁদের অক্ষ পৃথিবীর তুলনায় সামান্য হেলে থাকার কারণে আমরা কখনো উত্তর মেরু, কখনো দক্ষিণ মেরু দেখতে পাই।
| দ্রাঘিমাংশের লিব্রেশন |
চাঁদ পৃথিবীর কাছাকাছি এলে দ্রুত চলে এবং দূরে গেলে ধীর হয়। এই গতি পরিবর্তনের ফলে পাশ থেকে কাঁপতে দেখা যায়।এছাড়াও পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে দৈনিক লিব্রেশন ঘটে। ফলে চাঁদ উদয় ও অস্তের সময় ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়। এই সব প্রভাবের সম্মিলিত ফলে আমরা চাঁদের প্রায় ৫৯ শতাংশ পৃষ্ঠ সময়ের সাথে সাথে দেখতে সক্ষম হই।
নিবন্ধ: এফ. রহমান
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট