News & Articles
You will get the latest news about Astronomy
2024 April 15
455 views

আমরা কেন সবসময় চাঁদের একই দিক দেখতে পাই?
আমরা যখন চাঁদ সম্পর্কে কথা বলি তখন প্রায়শই চাঁদকে একটি ‘পরিচিত মুখ’ বলে বর্ণনা করি। সেই পরিচিত মুখে আমরা উজ্জ্বল উচ্চভূমি বা অন্ধকারময় কালো পাহাড় দেখতে পাই, যা সহস্রাব্দ ধরে আমাদের দিকে ঘুরে অনন্তকাল থেকে আমাদের চারদিকে প্রদক্ষিণ করছে।


কিন্তু একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে—কেন আমরা শুধু চাঁদের এই এক পাশই দেখতে পাই? আমরা জানি যে পৃথিবী তার অক্ষের চারপাশে ঘুরছে, তাহলে কেন আমরা চাঁদের সম্পূর্ণ পৃষ্ঠ দেখতে পাই না, যেমনটি আশা করা যায় যখন চাঁদ নিজেও ঘুরছে?


ছবিঃ পূর্ণিমা

যদি আপনি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী চাঁদকে পাখির চোখে দেখতে পারতেন, তাহলে আপনি লক্ষ্য করতেন যে চাঁদ প্রতি ২৭.৩ দিনে একবার তার নিজের অক্ষের উপর ঘোরে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীকে একবার সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করতেও চাঁদের ঠিক একই পরিমাণ সময় লাগে। এর ফলাফল হলো, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সব সময় চাঁদের একই গোলার্ধ দেখতে পাই।

তবে বিষয়টি পুরোপুরি এতটা সরল নয়। কারণ আমরা চাঁদের পৃষ্ঠের অর্ধেকের চেয়ে সামান্য বেশি অংশ দেখতে পাই। এই ঘটনাটিকে বলা হয় চন্দ্র লিব্রেশন (Lunar Libration)। চাঁদের কক্ষপথ ও ঘূর্ণনের সূক্ষ্ম দোলাচল প্রভাবের কারণেই এটি ঘটে।


ছবিঃ চন্দ্র লিব্রেশনের জন্য আমরা চাঁদের পৃষ্ঠের অর্ধেকের কিছু বেশি অংশ পর্যবেক্ষণ করতে পারি।

যদি চাঁদ তার প্রতি কক্ষপথে একবারের চেয়ে দ্রুত বা ধীর গতিতে ঘুরত, তবে আমরা ধীরে ধীরে পুরো চাঁদটাই দেখতে পেতাম।জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয়, চাঁদ পৃথিবীর সাথে ‘জোয়ারে বাধা’ (tidally locked) অবস্থায় রয়েছে।

চাঁদ কীভাবে জোয়ার-ভাটার সাথে বাধা পড়ে গেল?
প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে যখন চাঁদ গঠিত হয়েছিল, তখন চাঁদ আজকের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত ঘুরছিল। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে চাঁদের ভেতরে একটি পাথুরে বন্ধন সৃষ্টি হয়। এর ফলে চাঁদ একটি নিখুঁত গোলকের পরিবর্তে সামান্য লেবুর আকৃতির হয়ে ওঠে, যার একটি চিমটি যুক্ত প্রান্ত আমাদের গ্রহের দিকে মুখ করে থাকে।

শুরুর দিকে চাঁদের দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে সেই স্ফীত অংশের অবস্থান পরিবর্তিত হতে থাকে এবং একসময় এটি আমাদের সমুদ্রের জোয়ারের পৃষ্ঠের মতো উপরিভাগে স্থানান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়াটি কার্যকরভাবে একটি প্রাকৃতিক ব্রেক হিসেবে কাজ করে। ধীরে ধীরে চাঁদের ঘূর্ণনের গতি কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত চাঁদের ঘূর্ণনকাল তার কক্ষপথের সময়কালের সাথে ভারসাম্যে পৌঁছে। এর ফলে পৃথিবীর মুখোমুখি চন্দ্র গোলার্ধটি এক জায়গায় স্থির হয়ে যায়।


ছবিঃ সংঘর্ষের ধ্বংসাবশেষ থেকে চাঁদের গঠনের চিত্র।

তাহলে কেন চাঁদের চেহারা পরিবর্তন হয়?
যদিও চাঁদ সবসময় আমাদের দিকে একই দিক মুখ করে রাখে, তবুও আমরা লক্ষ্য করি যে এটি এক রাত থেকে পরবর্তী রাত পর্যন্ত একইভাবে আলোকিত হয় না। আপনি ছবিতে যা দেখছেন তা হলো চাঁদের পরিবর্তনশীল পর্যায়। এই পর্যায়গুলো মূলত পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান সূর্যালোকে চাঁদের আলোকিত অংশের অনুপাতকে প্রকাশ করে।

মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, যদিও চাঁদের কেবল একটি ভগ্নাংশ আমাদের কাছে আলোকিত বলে মনে হয়, বাস্তবে চাঁদের মোট পৃষ্ঠের ৫০ শতাংশ যে কোনো সময়ে সূর্যের আলোয় আলোকিত থাকে। কিন্তু আমরা সবসময় সেটি দেখতে পাই না।


ছবিঃ চাঁদ সবসময় একই মুখ আমাদের দিকে ঘুরিয়ে রাখে, কিন্তু সেই মুখটি বদলায়।

এই কারণেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আমাদের থেকে দূরে অবস্থিত চাঁদের দিকটিকে ‘অন্ধকার দিক’ বলতে পছন্দ করেন না। কারণ সেটি সবসময় অন্ধকার থাকে না। বরং তারা একে চাঁদের দূরের দিক বলে উল্লেখ করেন। চন্দ্র পর্যায় চক্র, যা চন্দ্রাভিযান নামেও পরিচিত, অমাবস্যা থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই চক্রে অর্ধচন্দ্র, চতুর্মাসিক চাঁদ এবং গিব্বাস চাঁদের ধাপগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। পুরো চক্রটি সম্পন্ন হতে প্রায় ২৯.৫ দিন সময় নেয়।


ছবিঃ এটি চাঁদের অপর পাশের ছবি, যা লুনার রিকনেসান্স অরবিটার দ্বারা তোলা।

চন্দ্র চক্র ও কক্ষপথের অমিল
অভ্যন্তরীণ বৃত্তটি দেখায় যে চাঁদটি তখন কেমন দেখায় যখন সেটি উত্তর মেরুর উপর থাকে। বাইরের বৃত্তটি দেখায় আমরা সেই একই সময়ে পৃথিবী থেকে চাঁদের যে ধাপটি দেখি। যদিও চাঁদের একটি পূর্ণ চক্র, যাকে সিনোডিক মাস (Synodic Month) বলা হয়, সম্পন্ন হতে ২৯.৫ দিন সময় লাগে, তবে পৃথিবীর চারপাশে চাঁদের একটি কক্ষপথ সম্পূর্ণ করতে, যাকে পার্শ্বীয় মাস (Sidereal Month) বলা হয়, লাগে মাত্র ২৭.৩ দিন। এই চন্দ্রচক্রের অমিলটি দেখা দেয় তখন, যখন পৃথিবীর একজন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদকে একই পর্যায়ে ফিরে আসার সময় হিসাব করা হয়। যেহেতু পৃথিবী নিজেই সূর্যের চারপাশে তার কক্ষপথে ক্রমাগত চলমান, তাই চাঁদকে তার নিজস্ব কক্ষপথ সম্পূর্ণ করার চেয়ে সামান্য বেশি সময় নিতে হয়।

ছবিঃ চাঁদের বিভিন্ন পর্যায়।

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, চাঁদ যখন অমাবস্যায় পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করে, তখন সূর্যগ্রহণ এত বিরল কেন। একইভাবে, পূর্ণিমার সময়ে আমরা কেন নিশ্চিতভাবে চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পাই না। এর মূল কারণ হলো,পৃথিবীর চারপাশে চাঁদের কক্ষপথ সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথের তুলনায় প্রায় ৫ ডিগ্রি হেলে রয়েছে। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সরলরেখার সামঞ্জস্য সামান্য মিস হয়ে যায়।



নিবন্ধ: এফ. রহমান

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট