News & Articles
You will get the latest news about Astronomy
2026 January 21
15 views

খালি হাতে আকাশের কোণ পরিমাপ !

হাত ব্যবহার করে নক্ষত্র ও আকাশের দূরত্ব নির্ণয়ের সহজ কৌশল

রাতের আকাশ আমাদের সামনে খুলে দেয় এক বিশাল রহস্যের জগৎ। অসংখ্য তারা, গ্রহ আর নক্ষত্রমণ্ডল দেখে স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসে—একটি তারা আরেকটি তারার থেকে কতটা দূরে? এই দূরত্ব কি শুধু টেলিস্কোপ বা আধুনিক অ্যাপ দিয়েই বোঝা সম্ভব? আসলে নয়। খুব সাধারণভাবে, খালি হাত ব্যবহার করেই আকাশের কোণ ও নক্ষত্রের কৌণিক দূরত্ব বেশ নির্ভুলভাবে অনুমান করা যায়। এই লেখায় আমরা জানবো কীভাবে আঙুল, মুঠি আর হাতের প্রসার ব্যবহার করে আকাশের বিভিন্ন ডিগ্রি মাপা যায় এবং কীভাবে এই কৌশল কাজে লাগিয়ে নক্ষত্রমণ্ডল চেনা, ধ্রুবতারা খোঁজা বা আকাশ পর্যবেক্ষণকে আরও সহজ করা যায়। নতুনদের জন্য যেমন এটি উপকারী, তেমনি অভিজ্ঞ আকাশপ্রেমীদের কাছেও এটি একটি কার্যকর ও সময়-পরীক্ষিত পদ্ধতি।এই পদ্ধতি বহু শতাব্দী ধরে জ্যোতির্বিদরা ব্যবহার করে আসছেন এবং আজও এটি অপেশাদার আকাশ পর্যবেক্ষকদের জন্য ভীষণ কার্যকর।

এই পদ্ধতি বহু শতাব্দী ধরে জ্যোতির্বিদরা ব্যবহার করে আসছেন এবং আজও এটি অপেশাদার আকাশ পর্যবেক্ষকদের জন্য ভীষণ কার্যকর।

আকাশের “কোণ” বলতে কী বোঝায়?

আকাশের “কোণ” বলতে আসলে আকাশের কোনো দুটি বস্তুর মাঝের সরাসরি দূরত্ব বোঝাই না। কারণ তারা, গ্রহ বা চাঁদ আমাদের থেকে এতটাই দূরে যে তাদের মধ্যকার দূরত্ব কিলোমিটার বা মাইল দিয়ে কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। তাই জ্যোতির্বিদ্যায় দূরত্ব বোঝাতে ব্যবহার করা হয় কৌণিক পরিমাপ, যাকে বলা হয় Angular Distance।

সহজভাবে ভাবলে, আপনি পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন। আপনার চোখ থেকে দেখা অবস্থায় দুটি তারা বা একটি তারা ও চাঁদের মাঝখানে যে কল্পিত কোণ তৈরি হয়, সেটাই আকাশের “কোণ”।

এই কোণ ডিগ্রিতে মাপা হয়। কোণ যত বড়, আকাশে সেই দুই বস্তুকে তত বেশি দূরে দেখা যায়, আর কোণ ছোট হলে তারা একে অপরের কাছাকাছি মনে হয়। এই কৌণিক ধারণা বুঝতে পারলেই আকাশ পর্যবেক্ষণ অনেক সহজ হয়ে যায়।

তখন আপনি টেলিস্কোপ বা অ্যাপ ছাড়াই আন্দাজ করতে পারেন কোন নক্ষত্রটি কোনটির কতটা কাছে, বা আকাশের কোন অংশটি কতটা জায়গা জুড়ে রয়েছে।

কেন খালি হাত দিয়ে কোণ পরিমাপ শেখা দরকার?
  • টেলিস্কোপ ছাড়াই আকাশ পর্যবেক্ষণ করা যায়
  • নক্ষত্রমণ্ডল চিনতে সহজ হয়
  • Messier অবজেক্ট বা গ্রহ খুঁজে পেতে সুবিধা
  • নতুনদের জন্য সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত শেখার কৌশল
  • মোবাইল বা অ্যাপ না থাকলেও কাজ করে

এই কৌশলটি বিশেষভাবে কাজে আসে dark sky site বা গ্রামে আকাশ দেখার সময়। এই পদ্ধতিটি মূলত অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল, বিশেষ করে যখন টেলিস্কোপ বা বিশেষ যন্ত্র হাতে নেই।

আকাশের ডিগ্রি বোঝার মৌলিক ধারণা

আকাশের ডিগ্রি বা “কোণ” বোঝার মৌলিক ধারণা আসলে খুব জটিল কিছু নয়, যদি আমরা এটাকে সহজভাবে ভাবি। পুরো আকাশটাকে কল্পনা করা যায় একটি বিশাল গোলকের মতো, যার চারপাশে মোট ৩৬০ ডিগ্রি। আমরা যদিও একসাথে পুরো আকাশ দেখতে পারি না, তবু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে প্রায় অর্ধেক আকাশ, অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত আমাদের চোখে ধরা পড়ে। পূর্ব দিগন্ত থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত বা উত্তর থেকে দক্ষিণ দিগন্ত পর্যন্ত যে আকাশ বিস্তৃত থাকে, সেটার কৌণিক পরিমাণ ১৮০ ডিগ্রি। আবার দিগন্ত থেকে সোজা মাথার উপর পর্যন্ত তাকালে সেই দূরত্ব হয় ৯০ ডিগ্রি।


এই ধারণাগুলো আমাদের আকাশকে মানচিত্রের মতো বুঝতে সাহায্য করে। আকাশের ডিগ্রি বোঝার এই মৌলিক ধারণা জানা থাকলে নক্ষত্রের অবস্থান কল্পনা করা সহজ হয়। তখন আপনি বুঝতে পারবেন কোনো তারা দিগন্তের কতটা ওপরে আছে, বা দুটি নক্ষত্রের মাঝখানে আকাশের কতটুকু জায়গা রয়েছে। আকাশ পর্যবেক্ষণের শুরুতেই এই বিষয়টি পরিষ্কার করে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খালি হাত দিয়ে কোণ পরিমাপের মূল ধারণা

এবার মূল কাজ শুরু করি। আমরা খালি হাতেই আকাশ মাপবো। এ জন্যে আপনাকে ডান বা বাম হাতটি লম্বা করে প্রসারিত করে সামনে মেলে ধরতে হবে। এবার আকাশের যে দিকের পরিমাপ নিতে চান হাতটি সেদিকে ধরুন। হাতকে টান টান করে রাখতে হবে, বাঁকিয়ে রাখা যাবে না।


একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগে জানা দরকার—হাত পুরো সোজা করে ধরতে হবে এবং চোখ ও হাতের দূরত্ব সবসময় প্রায় একই রাখতে হবে কারণ কোণ নির্ভর করে দূরত্বের ওপর। আকাশের ডিগ্রি পরিমাপে আঙ্গুল ও মুষ্ঠি ডিগ্রি মাপার নিয়ম ছবি থেকে দেখে নিন।

বিভিন্ন ডিগ্রির পরিমাপ (খালি হাতে)
  • ১ ডিগ্রি মাপার উপায় এক আঙুল (Index Finger) প্রস্থ ≈ ১ ডিগ্রি  সূক্ষ্ম পরিমাপের জন্য সবচেয়ে কার্যকর
  • ৩ ডিগ্রি মাপার উপায় দুই আঙুল (Two Fingers) তর্জনী ও মধ্যমা ,প্রস্থ ≈ ৩ ডিগ্রি  গ্রহ ও উজ্জ্বল তারার মাঝের দূরত্ব বোঝার জন্য ভালো
  • ৫ ডিগ্রি মাপার উপায় তিন আঙুল (Three Fingers) তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকা পাশাপাশি,প্রস্থ ≈ ৫ ডিগ্রি  অনেক নক্ষত্রমণ্ডলের অংশ মাপতে দারুণ কাজে লাগে


সপ্তর্ষীমণ্ডলীর দুটি নক্ষত্র দুবে ও মেরাক ৫ ডিগ্রি দূরে। এই দুটিকে যোগ করে ছয় গুণ সামনে গেলেই পাওয়া যায় ধ্রুবতারা।

  • ১০ ডিগ্রি মাপার উপায় মুঠো (Fist)হাত মুঠো করে সামনে ধরুন,প্রস্থ ≈ ১০ ডিগ্রি আকাশে চাঁদের ব্যাস প্রায় ০.৫ ডিগ্রি অর্থাৎ একটি মুঠো ≈ ২০টি পূর্ণ চাঁদের সমান
  • ১৫ ডিগ্রি মাপার উপায় ধ্রুবতারা থেকে কোচাবের কৌণিক দূরত্ব ১৫ ডিগ্রি।


  • ২৫ ডিগ্রি  মাপার উপায় বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কনিষ্ঠার প্রসার (Hand Span) পুরো হাত ছড়িয়ে ধরুন,প্রস্থ ≈ ২০–২৫ ডিগ্রি (ব্যক্তিভেদে ভিন্ন),বড় নক্ষত্রমণ্ডল যেমন ওরিয়ন বা বিগ ডিপার মাপতে কাজে লাগে


সপ্তর্ষীমণ্ডলী থেকে ধ্রুব তারার কৌণিক দূরত্ব প্রায় ২৫ ডিগ্রি।

  • ৫০ ডিগ্রি মাপার উপায় ৫০ ডিগ্রি মাপার জন্যে,দুই হাতকে মিলিয়ে একত্রে ২৫ ডিগ্রি করে মাপলেই হয়ে গেল। এইভাবে


সপ্তর্ষীমণ্ডলী থেকে সিংহমণ্ডলীর উজ্জ্বলতম ও আকাশের ২১ তম উজ্জ্বল নক্ষত্র রেগুলাসের কৌণিক দূরত্ব ৫০ ডিগ্রি।

শেষ কথা

এই খালি হাতে কোণ পরিমাপের কৌশল স্টার হপিং, নক্ষত্রমণ্ডলী চেনা, ধ্রুবতারা খোঁজা এবং টেলিস্কোপ সেটআপের সময় অত্যন্ত কার্যকর। নতুন জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি প্রাথমিক কিন্তু শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।


নিবন্ধ: এফ. রহমান

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট