News & Articles
You will get the latest news about Astronomy
2026 January 28
55 views

মহাবিশ্বের অদৃশ্য যোগাযোগ ও আইনস্টাইনের ভুতুড়ে রহস্য!
মহাবিশ্বে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা প্রথম শুনলে রূপকথার মতো মনে হয়। দূরে থাকা দুটি কণা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে, কোনো তার নেই, কোনো সিগন্যাল নেই, তবুও তারা যেন মুহূর্তেই খবর আদান–প্রদান করছে। এই অদ্ভুত ধারণাকেই অনেক বিজ্ঞানী মজা করে বলেন “মহাবিশ্বের অদৃশ্য টেলিফোন”। আর এই রহস্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন।


ভুতুড়ে রহস্যের শুরু

১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন ও তাঁর সহকর্মীরা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এই বৈশিষ্ট্যের নাম আজ আমরা জানি কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট। আইনস্টাইন এটাকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। তিনি একে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন “Spooky action at a distance”, বাংলায় বললে, “দূর থেকে ভুতুড়ে প্রভাব”। আইনস্টাইনের আপত্তির মূল কারণ ছিল সহজ। তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো তথ্য আলোর গতির চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না। কিন্তু কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট যেন সেই নিয়ম ভেঙে ফেলছে।

কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট কী?
ধরা যাক, দুটি কণা একসঙ্গে তৈরি হলো এবং তারা বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে গেল। এই অবস্থায় একটি কণার অবস্থা নির্ধারণ করলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য কণার অবস্থাও নির্ধারিত হয়ে যায়, দূরত্ব যতই হোক না কেন। একটি কণা যদি পৃথিবীতে থাকে আর অন্যটি চাঁদে বা তারও অনেক দূরে থাকে, তবুও একটিকে মাপলে অন্যটির ফল সঙ্গে সঙ্গে জানা যায়। মাঝখানে কোনো তার নেই, কোনো রেডিও তরঙ্গ নেই। এখান থেকেই আসে “অদৃশ্য টেলিফোন”-এর ধারণা।

আইনস্টাইনের সন্দেহ
আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতি এতটা অদ্ভুত হতে পারে না। তাঁর ধারণা ছিল, নিশ্চয়ই কণাগুলোর ভেতরে আগে থেকেই কিছু লুকানো তথ্য আছে, যাকে বলা হয় “hidden variables”। আমরা শুধু তা জানি না। কিন্তু কোয়ান্টাম তত্ত্ব বলছে ভিন্ন কথা। কণার বৈশিষ্ট্য আগে থেকে নির্দিষ্ট নয়, মাপার সময়ই তা নির্ধারিত হয়। এই ধারণা আইনস্টাইনের বাস্তববাদী চিন্তার সঙ্গে খাপ খেত না।

পরীক্ষায় কী পাওয়া গেল?
আইনস্টাইনের মৃত্যুর বহু বছর পর, ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে বিজ্ঞানী জন বেল একটি পরীক্ষাযোগ্য সূত্র দেন, যাকে বলা হয় Bell’s Theorem। এরপর নানা পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রকৃতি সত্যিই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের পক্ষেই কথা বলছে। বারবার পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, এনট্যাঙ্গেলমেন্ট বাস্তব। আইনস্টাইনের সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও, এই “ভুতুড়ে প্রভাব” সত্যিই ঘটে।

তাহলে কি আলোর গতির নিয়ম ভাঙে?
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এনট্যাঙ্গেলমেন্ট দিয়ে সরাসরি তথ্য পাঠানো যায় না, তাই আপেক্ষিকতা তত্ত্ব পুরোপুরি ভাঙে না। এটি কোনো সাধারণ টেলিফোন নয়। বরং এটি দেখায়, প্রকৃতির গভীর স্তরে বাস্তবতা আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক বেশি অদ্ভুত।

আধুনিক বিজ্ঞানে এর ব্যবহার
আজ এই ভুতুড়ে রহস্য শুধু তাত্ত্বিক কৌতূহল নয়।এনট্যাঙ্গেলমেন্ট ব্যবহার হচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে অতিরাপদ কোয়ান্টাম যোগাযোগে ভবিষ্যতের ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে যে বিষয়কে একসময় আইনস্টাইন “ভুতুড়ে” বলে অবিশ্বাস করেছিলেন, সেটিই এখন আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি হয়ে উঠছে।

শেষ কথা
মহাবিশ্বের অদৃশ্য টেলিফোন আমাদের শেখায়, প্রকৃতি সবসময় আমাদের সাধারণ যুক্তির মধ্যে ধরা দেয় না। আইনস্টাইনের মতো মহান বিজ্ঞানীও সব প্রশ্নের উত্তর পাননি। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন তোলার সাহসই বিজ্ঞানের পথকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। আজ আমরা জানি, এই ভুতুড়ে রহস্য আসলে মহাবিশ্বের গভীর বাস্তবতার একটি জানালা। যত বেশি আমরা জানছি, ততই বুঝছি, মহাবিশ্ব আমাদের কল্পনার চেয়েও বিস্ময়কর।


তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট


নিবন্ধ: এফ. রহমান