সপ্তর্ষীমণ্ডলীর খোঁজে: আকাশের সাত ঋষি ও ধ্রুবতারার পথ সপ্তর্ষীমণ্ডলী কী? তারামণ্ডলীর অবস্থান, তারা ও ইতিহাস |

ছবি: সপ্তর্ষিমণ্ডলী
আর্সা ম্যাজর (Ursa Major), যা আমাদের কাছে সপ্তর্ষীমণ্ডলী নামে পরিচিত, তার তারকাগুলোর সম্মিলিত আকৃতি দেখতে অনেকটা একটি ভালুকের মতো। এই তারামণ্ডলীতে মোট তারকার সংখ্যা অন্তত ৭২০টি। এর মধ্যে ২১টি তারকার চারপাশে গ্রহের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। এই মণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকার নাম এলিওথ (Alioth), যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় পরিচিত এপসাইলন আরসি ম্যাজোরিস (Epsilon Ursae Majoris) নামে।
| নামকরণ |
এই মণ্ডলীর ইংরেজি নাম Ursa Major বা The Great Bear, যার অর্থ বৃহৎ ভালুক। গ্রিকরা বহু তারার সমন্বয়ে গঠিত ভালুকের মতো আকৃতির এই নক্ষত্রমণ্ডলকে Ursa Major নামে শনাক্ত করেছিলেন।
অন্যদিকে ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা এই নক্ষত্রমণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল সাতটি তারাকেই প্রধানত পর্যবেক্ষণ করেন, যেগুলো প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো বিন্যাসে অবস্থান করে। তাই তারা এই তারামণ্ডলীর এমন নাম দেন।
তবে ধ্রুবতারা খোঁজার কাজে এই বিপুল সংখ্যক তারকার প্রয়োজন হয় না। কাজে লাগে মাত্র সাতটি তারকা। এই সাতটি তারকা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি উজ্জ্বল এবং একত্রে এদের আকৃতি দেখতে অনেকটা পেয়ালার মতো। পাশ্চাত্যের জ্যোতির্বিদরাও এই সাতটি তারাকে আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করেন এবং নাম দেন The Big Dipper। এই কারণেই আমেরিকায় এই সাত তারকাকে বলা হয় বিগ ডিপার (Big Dipper), অর্থাৎ বড় পেয়ালা।
আবার এই তারকাগুলোর বিন্যাস অনেকটা লাঙলের মতো হওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একে বলা হয় প্লাউ (Plough)। আর যেহেতু এই তারামণ্ডলীর মধ্যে এই সাতটি তারকা সবচেয়ে সহজে দৃশ্যমান এবং তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল, তাই বাংলায় পুরো মণ্ডলীর নামই রাখা হয়েছে এই সাতটি তারকার ভিত্তিতে—সপ্তর্ষীমণ্ডল।
| অবস্থান |
সপ্তর্ষীমণ্ডল সারা বছরই ধ্রুবতারার চারদিকে ঘোরে। সপ্তর্ষীমণ্ডলীর প্রথম দুটি তারা ক্রতু ও পুলহ–কে যোগ করে একটি সরলরেখা কল্পনা করলে সেই রেখা সরাসরি ধ্রুবতারার দিকে নির্দেশ করে। আবার সেই রেখাকে বিপরীত দিকে বাড়ালে তা সিংহ রাশি (Leo)–এর দিকে নির্দেশ করে। বশিষ্ঠ তারার পাশে একটি ছোট তারকা দেখা যায়, যার নাম অরুন্ধতী। অরুন্ধতী ছিলেন ঋষি বশিষ্ঠের স্ত্রী।
ছবি: সপ্তর্ষীমণ্ডলী
ভালুকের লেজসহ পেছন দিকে থাকা ৭টি তারকার উপর ফোকাস করুন। এরাই হলো বিগ ডিপার। এই নাম শুনে অনেকের মনে হতে পারে যে এই তারামণ্ডলীতে বুঝি মাত্র সাতটি তারকাই রয়েছে। বাস্তবে কিন্তু সপ্তর্ষীমণ্ডলীতে তারকার সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। সপ্তর্ষীমণ্ডলের ইংরেজি নাম Ursa Major বা Great Bear।
দ্বিতীয় শতকের জ্যোতির্বিদ টলেমি প্রণীত ৪৮টি তারামণ্ডলের মধ্যে এটি একটি। আধুনিক কালে বর্ণিত ৮৮টি তারামণ্ডলের তালিকাতেও এটি তৃতীয় বৃহত্তম। এই নক্ষত্রমণ্ডলটি সাতটি প্রধান তারার সমন্বয়ে গঠিত হিসেবে বেশি পরিচিত। উত্তর গোলার্ধ থেকে সারা বছরই এই তারামণ্ডলকে দেখা যায়।
| সপ্তর্ষির তারা পরিচিতি |
সপ্তর্ষীমণ্ডলীর ৭টি প্রধান তারাকেই আমরা সপ্তর্ষি বলে থাকি। এদের উজ্জ্বলতা প্রায় সমান।
ভারতীয় উপমহাদেশের জ্যোতির্বিদগণ এই সাতটি তারার নাম সাতজন ঋষির নামে নামকরণ করেন। সেই কারণেই এই নক্ষত্রমণ্ডলটি সপ্তর্ষি মণ্ডল নামে পরিচিত হয়।
সাতজন ঋষির নাম
- ক্রতু
- পুলহ
- পুলস্ত্য
- অত্রি
- অঙ্গিরা
- বশিষ্ঠ
- মরীচি

ছবি: সপ্তর্ষীমণ্ডলীর ৭টি প্রধান তারা
| দূরত্ব ও বিস্তার |
Ursa Major প্রায় ১২৭৯.৬৬ বর্গ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা সম্পূর্ণ আকাশের প্রায় ৩.১%। ১৯৩০ সালে Eugène Delporte এই তারামণ্ডলীর সীমানা নির্ধারণ করেন। সীমানাটি একটি ২৮ বাহুবিশিষ্ট অনিয়মিত পলিগন। যদিও এই তারাগুলো পৃথিবী থেকে ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত, তবুও এদের আপাত উজ্জ্বলতা প্রায় একই। কারণ অপেক্ষাকৃত দূরের তারাগুলো প্রকৃতপক্ষে বেশি দীপ্তিময়, অর্থাৎ তাদের অভ্যন্তরীণ উজ্জ্বলতা বা দীপ্তি বেশি।

ছবি: আপাত উজ্জ্বলতা
এই তারামণ্ডলীর সীমানায় মোট ৮টি আলাদা Constellation অবস্থিত। উত্তর ও উত্তর-পূর্বে Draco,পূর্বে Boötes,পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে Canes Venatici,দক্ষিণ-পূর্বে Coma Berenices,দক্ষিণে Leo ও Leo Minor,দক্ষিণ-পশ্চিমে Lynx,এবং উত্তর-পশ্চিমে Camelopardalis।International Astronomical Union ১৯২২ সালে এই তারামণ্ডলীর সংক্ষিপ্ত নাম নির্ধারণ করে UMa।

ছবি: সপ্তর্ষীমণ্ডলীর তারা
নিবন্ধ: এফ. রহমান
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট [১] আর্সা ম্যাজর- উইকিপিডিয়া [২] আর্থ স্কাই