সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব:অপসূর,অনুসূর,মহাবিষুব, উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়ন |
পৃথিবীর প্রদক্ষিণপথ উপবৃত্তাকার হওয়ায় এবং পৃথিবীর অক্ষ (Earth Axis) ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে থাকার কারণে পৃথিবী এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্য থেকে ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে অবস্থান করে।

এর ফলস্বরূপ পৃথিবীর সব অঞ্চলে সূর্যের আলো ও তাপ সমানভাবে পড়ে না এবং দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের মধ্যেও পার্থক্য সৃষ্টি হয়। সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্বের এই তারতম্য এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
| গ্রহের কক্ষপথ কেন উপবৃত্তাকার? |
সূর্যের চারদিকে ঘূর্ণায়মান কোনো বস্তু সাধারণত সম্পূর্ণ বৃত্তাকার কক্ষপথে নয়, বরং অনেকটা উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে থাকে। অধিকাংশ গ্রহের কক্ষপথ ছড়ানো এবং ডিম্বাকৃতির মতো। আরও সঠিকভাবে বললে, তা উপবৃত্তাকার।
এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথের কারণেই সূর্য থেকে গ্রহগুলোর দূরত্ব সর্বদা নির্দিষ্ট থাকে না। ফলে সূর্য থেকে গ্রহের দূরত্ব কখনও কমে আবার কখনও বাড়ে। সৌরজগতের সব গ্রহই এই নিয়ম অনুসরণ করে।

উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্য থেকে বুধ গ্রহের দূরত্বের পরিবর্তন
| অপসূর (Aphelion) কী? |
অপসূর (Aphelion) শব্দটি গ্রিক ভাষার apo এবং helios শব্দ থেকে এসেছে। এখানে apo অর্থ দূরে এবং helios অর্থ সূর্য। বাংলা অপসূর শব্দের ক্ষেত্রেও ‘অপ’ অর্থ দূরে এবং ‘সূর’ অর্থ সূর্য।
অর্থাৎ, সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরের অবস্থান। সাধারণভাবে অপসূর বলতে সূর্য থেকে কোনো গ্রহ বা গ্রহাণুর সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থানকে বোঝায়। সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণকালে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রতি বছর ৪ জুলাই তার সর্বোচ্চ মানে পৌঁছে। এ সময় পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব থাকে প্রায় ১৫ কোটি ২০ লক্ষ (১৫২ মিলিয়ন) কিলোমিটার।
পৃথিবী থেকে সূর্যের এই দূরবর্তী অবস্থানকেই অপসূর বলা হয়।
| অপসূর অবস্থান |
পরিক্রমণের সময় ৪ জুলাই পৃথিবী থেকে সূর্যের রৈখিক দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিলোমিটার। এই দিনটিকে অপসূর (অপ = দূরে; সূর = সূর্য) অবস্থান বলা হয়।

| অনুসূর (Perihelion) কী? |
অনুসূর (Perihelion) শব্দটি গ্রিক ভাষার peri এবং helios শব্দ থেকে এসেছে। peri অর্থ নিকটে এবং helios অর্থ সূর্য। বাংলা অনুসূর শব্দে ‘অনু’ অর্থ নিকটে এবং ‘সূর’ অর্থ সূর্য। অর্থাৎ সূর্যের নিকটবর্তী অবস্থান।
সাধারণভাবে অনুসূর বলতে সূর্য থেকে কোনো গ্রহ বা গ্রহাণুর সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থানকে বোঝায়। সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণকালে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রতি বছর ৩ জানুয়ারি সবচেয়ে কম হয়। এ সময় পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব থাকে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ (১৪৭ মিলিয়ন) কিলোমিটার। পৃথিবী থেকে সূর্যের এই নিকটবর্তী অবস্থানকেই অনুসূর বলা হয়।
অনুসূর হলো অপসূরের বিপরীত অবস্থান। অনুসূর অবস্থানকালে পৃথিবী অপসূর অবস্থানের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি সৌর তাপ গ্রহণ করে।
| অনুসূর অবস্থান |
পরিক্রমণের সময় জানুয়ারি মাসে পৃথিবী থেকে সূর্যের রৈখিক দূরত্ব কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ কিলোমিটার। এই দিনটিকে অনুসূর (অনু = নিকট; সূর = সূর্য) অবস্থান বলা হয়।
অনুসূর অবস্থান অতিক্রম করার সময় গ্রহগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুতগতিতে চলে এবং উল্টোভাবে অপসূর অতিক্রম করার সময় ধীরে চলে।

| সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব এবং ঋতুর সম্পর্ক |
সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় পৃথিবী প্রতি বছর একবার অনুসূর এবং একবার অপসূর অবস্থান অতিক্রম করে। অন্যান্য গ্রহও সূর্যকে একবার ঘুরে আসার সময় একবার করে এই দুটি বিন্দু অতিক্রম করে। সাধারণত জানুয়ারি মাসে পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে কাছে এবং জুলাই মাসে সবচেয়ে দূরে থাকে।
এই তথ্য অনেকের কাছে প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কারণ জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশসহ উত্তর গোলার্ধের বহু দেশে শীতকাল থাকে। তাহলে শীতকালে সূর্য সবচেয়ে কাছে থাকে—এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তবতা। আসলে পৃথিবীতে গরম বা শীত প্রধানত সূর্য থেকে দূরত্বের কারণে হয় না। এটি নির্ভর করে পৃথিবীর কক্ষীয় নততার উপর।
পৃথিবী তার কক্ষপথের সমতলের সাথে প্রায় সাড়ে তেইশ ডিগ্রি হেলে রয়েছে। ফলে যে অঞ্চল যখন সূর্যের দিকে বেশি হেলে থাকে, তখন সেখানে গ্রীষ্ম অনুভূত হয় এবং বিপরীত দিকে শীত বিরাজ করে। এই কারণেই জানুয়ারি মাসে উত্তর গোলার্ধে শীত থাকলেও দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল থাকে।

২০১০ সালে পৃথিবীর অপসূর ও অনুসূর
| সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব |
সূর্যের নিকটতম অবস্থানে পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৯ কোটি ১০ লক্ষ মাইল বা ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ কিলোমিটার। অপরদিকে অপসূর অবস্থানে এই দূরত্ব প্রায় ৯ কোটি ৫০ লক্ষ মাইল বা ১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিলোমিটার। এই দুই মানের গড় ধরে আমরা সাধারণত বলি সূর্য থেকে পৃথিবীর গড় দূরত্ব প্রায় ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল বা ১৫ কোটি কিলোমিটার।
পৃথিবী থেকে সূর্যের এই গড় দূরত্বকে বলা হয় অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (Astronomical Unit)। অনুসূর ও অপসূর শব্দগুলো শুধু গ্রহের ক্ষেত্রেই নয়, ধূমকেতু ও গ্রহাণুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো গ্রহ থেকে সূর্যের ন্যূনতম দূরত্বকে উক্ত গ্রহের অনুসূর (Periapsis) এবং এর বিপরীত অবস্থানকে অপসূর (Apoapsis) বলা হয়।
| বিষুব বা মহাবিষুব (Equinox) |
সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণকালে বছরে দুই দিন সূর্য পৃথিবীর নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখার উপর ঠিক লম্বভাবে অবস্থান করে। এই দুই দিন হলো ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর।
এ সময় সূর্যের কিরণ বিষুবরেখার উপর লম্বভাবে পড়ে। এই দুই দিনকে বিষুব বা মহাবিষুব (Equinox) বলা হয়। এর ফলে এই দুই দিনে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য সমান হয়।
| উত্তরায়ন (Summer Solstice) |
২১ মার্চের বিষুবীয় অবস্থানের পর সূর্যের কিরণ ধীরে ধীরে উত্তর দিকে সরে যেতে থাকে। ২১ জুন সূর্য পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের কর্কটক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। এই দিনটিকে সূর্যের উত্তরায়ন বা Summer Solstice বলা হয়। এই সময় উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল, দীর্ঘতম দিন ও ক্ষুদ্রতম রাত বিরাজ করে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল দেখা যায়।
Solstice শব্দটি ল্যাটিন solstitium শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ “সূর্য স্থির দাঁড়াল”। সূর্য কিরণ উত্তর দিকে সরে কর্কটক্রান্তির উপর স্থির দেখা যায় বলেই উত্তরায়ন নামটি প্রচলিত।
| দক্ষিণায়ন (Winter Solstice) |
২১ জুনের পর সূর্যের কিরণ ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে সরে যেতে থাকে। প্রায় ছয় মাস পরে, ২১ ডিসেম্বর, সূর্য পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের মকরক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। এই দিনটিকে সূর্যের দক্ষিণায়ন বা Winter Solstice বলা হয়।
এই সময় দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল এবং উত্তর গোলার্ধে শীতকাল বিরাজ করে। একই সঙ্গে উত্তর গোলার্ধে সবচেয়ে ছোট দিন ও দীর্ঘতম রাত দেখা যায়। ২১ ডিসেম্বরের পর সূর্য কিরণ আবার ধীরে ধীরে উত্তর দিকে সরে যেতে শুরু করে।
| শেষ কথা |
সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী দূরত্ব, অপসূর ও অনুসূর, বিষুব, উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়ন—এই সব ঘটনাই পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন, দিন-রাতের দৈর্ঘ্য এবং জলবায়ুর বৈচিত্র্য বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
নিবন্ধ: এফ. রহমান
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট,windows2universe.org,উইকিপিডিয়া