| পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু থাকলেও পূর্ব–পশ্চিম মেরু নেই কেন? |
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ঘূর্ণন, অক্ষ এবং দিক নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক নিয়মের ভেতরে।
| পৃথিবীর মেরু আসলে কী? |
মেরু বলতে এমন দুটি বিশেষ বিন্দুকে বোঝানো হয়, যেগুলো পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পৃথিবী নিজ অক্ষের চারদিকে ঘোরে। এই অক্ষটি পৃথিবীর কেন্দ্র দিয়ে অতিক্রম করা একটি কল্পিত সরলরেখা।
এই রেখাটি পৃথিবীর পৃষ্ঠে যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেখানেই তৈরি হয়েছে উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরু। অর্থাৎ, মেরু কোনো দিকনির্দেশনা নয়, বরং পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফল।

ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরু (Geographic south Pole)
| পৃথিবী কীভাবে ঘোরে এবং কেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ |
পৃথিবী প্রতি ঘন্টায় ১৬৭০ কি.মি. বেগে (সেকেন্ডে ৪৬৫ মি. বা ১০৭০ মাইল /ঘণ্টা) নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরছে। এই ঘুর্নণের দিক হচ্ছে পশ্চিম থেকে পূবে। এই নির্দিষ্ট দিকেই পৃথিবী সবসময় ঘোরে। আর এই ঘূর্নণের দিকই নির্ধারণ করেছে কোন দিক মেরু হবে। এই ঘূর্ণনের কারণেই পৃথিবীর একটি স্থির অক্ষ তৈরি হয়েছে। আর সেই অক্ষের দুই প্রান্তই হলো উত্তর ও দক্ষিণ মেরু।

পৃথিবীর দুই মেরুর ঠিক মাঝে অবস্থিত বিষুব অঞ্চল
এই যে ঘুর্ণন বেগ -এটি কার্যকর শুধুমাত্র বিষুব অঞ্চলের জন্য, যা দুই মেরুর ঠিক মাঝে অবস্থিত। বিষুব অঞ্চল থেকে যতই মেরুর দিকে যাওয়া হবে ততই এই বেগ হ্রাস পেতে থাকবে। পৃথিবীর ঘূর্ণন যদি অন্য কোনো দিকে হতো, তাহলে মেরুগুলোর অবস্থানও অন্যরকম হতো।
বিষুব রেখা থেকে মেরুর দিকে গেলে ঘূর্নণের হ্রাসপ্রাপ্ত মান বের করতে হলে স্বাভাবিক মানের সাথে অক্ষাংশের cos এর মান গুণ করতে হবে।
যেমন, ৪৫ ডিগ্রি অক্ষাংশে এই বেগ হবে 1670 *Cos 45 Km/h= 1670*.707 = 1180 Km/h।
এই মান কমতে কমতে মেরুতে গিয়ে হয় জিরো। কারণ মেরুতে অক্ষাংশ হল ৯০ ডিগ্রি। Cos 90 = 0 বলে গুনফল হয় জিরো।
এটাতো গাণিতিক মত। তবে গণিত কখোনই অসত্য কথা বলে না। মেরুতে বেগ কেন জিরো এটা একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, আমরা টপিকের মধ্যেই আছি। একটু পর বোঝা যাবে।
| দ্রাঘিমা রেখা এবং পূর্ব–পশ্চিম |
পৃথিবীতে পূর্ব ও পশ্চিম নির্ধারণ করা হয় দ্রাঘিমা রেখা বা লংগিটিউডের মাধ্যমে। এই রেখাগুলো উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, সব দ্রাঘিমা রেখাই শেষ পর্যন্ত মেরুতে মিলিত হয়। অর্থাৎ পূর্ব–পশ্চিম নিজে কোনো আলাদা মেরু তৈরি করে না।
| বিষুব অঞ্চলে বেগ বেশি, মেরুতে কেন শূন্য |
পৃথিবীর মাঝখানে আছে বিষুব অঞ্চল। এই অঞ্চলেই ঘূর্ণন বেগ সবচেয়ে বেশি। বিষুব থেকে যতই উত্তর বা দক্ষিণ দিকে যাওয়া যায়, ঘূর্ণন বেগ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এর কারণ খুব সহজ। পৃথিবী একটি গোলকের মতো। গোলকের মাঝখানে ঘোরার সময় পথ বেশি, কিন্তু উপরের বা নিচের দিকে সেই পথ ছোট হয়ে যায়।
গাণিতিকভাবে একে বোঝানো হয় অক্ষাংশের cos মান দিয়ে। ৪৫ ডিগ্রি অক্ষাংশে ঘূর্ণন বেগ হয় প্রায় ১১৮০ কিমি/ঘণ্টা। আর ৯০ ডিগ্রি অক্ষাংশে, অর্থাৎ মেরুতে cos 90 = 0 হওয়ায় বেগ দাঁড়ায় শূন্য।

উত্তর মেরু
বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক ধরুন, একটি খুঁটির সঙ্গে দড়ি বেঁধে দড়ির মাথায় কিছু ঘোরানো হচ্ছে। দড়ির শেষ প্রান্ত সবচেয়ে দ্রুত ঘোরে। খুঁটির কাছাকাছি অংশ খুব ধীরে ঘোরে, আর খুঁটির গায়েই বেগ প্রায় শূন্য। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। বিষুব অঞ্চল দড়ির প্রান্তের মতো, আর মেরু হলো খুঁটির মতো।
| তাহলে পূর্ব ও পশ্চিম কেন মেরু হতে পারে না |
এখন আসি মূল প্রশ্নে। পূর্ব ও পশ্চিম আসলে কোনো স্থির বিন্দু নয়। এগুলো আপেক্ষিক দিক এগুলো দিক নির্দেশনা মাত্র। সূর্য যেদিক থেকে ওঠে, সেটাকে আমরা পূর্ব বলি এবং যেদিকে অস্ত যায়, সেটাকে পশ্চিম বলি।
এই দিকগুলো সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপর। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যকে উঠতে দেখেন, সেটি আপনার কাছে পূর্ব। কিন্তু পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা একজনের কাছে সেই দিকটি ভিন্ন হতে পারে।
পূর্ব বা পশ্চিমে এমন কোনো শেষ সীমা নেই, যেখানে গিয়ে বলা যাবে, এর পরে আর পূর্ব নেই।
| পূর্ব–পশ্চিমে হাঁটলে কী হয় |
ধরুন, আপনি বাংলাদেশ থেকে পূবে হাঁটা শুরু করলেন। আপনি একসময় আমেরিকায় পৌঁছাবেন। আরও এগোলে আবার আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশেই ফিরে আসবেন। এই যাত্রায় সবসময়ই পশ্চিম আপনার পেছনে থাকবে।
আপনি কখনো এমন কোনো বিন্দুতে পৌঁছাবেন না, যেখানে দিক হঠাৎ উল্টে যাবে।

পৃথিবীর ম্যাপকে একটু ভিন্নভাবে দেখানো হল। তাহলে আমেরিকা আসলে আমাদের থেকে পূর্ব দিকে নাকি পশ্চিম দিকে?
| কিন্তু উত্তর–দক্ষিণে হাঁটলে দিক উল্টে যায় কেন |
এবার ভাবুন, আপনি উত্তর দিকে হাঁটছেন। একসময় আপনি উত্তর মেরুতে পৌঁছাবেন। সেখানে পৌঁছে আর এক পা এগোলেই আপনার সামনে হয়ে যাবে দক্ষিণ, আর পেছনে থাকবে উত্তর। আপনি ঘোরেননি, কিন্তু দিক বদলে গেছে।

এই ঘটনা শুধু উত্তর ও দক্ষিণের ক্ষেত্রেই ঘটে, কারণ এগুলো প্রকৃত প্রান্তিক বিন্দু। উত্তর ও দক্ষিণ মেরু হলো পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফল, আর পূর্ব ও পশ্চিম হলো মানুষের তৈরি দিকনির্দেশনা। ঘূর্ণনের অক্ষ থাকলে মেরু থাকে, কিন্তু দিকের ক্ষেত্রে কোনো অক্ষ নেই। তাই পূর্ব বা পশ্চিম মেরু বলে কিছু নেই।
| কেন এই বিষয়টি জ্যোতির্বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ? |
এই ধারণা বোঝা জরুরি, কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণন, সময় নির্ণয়, দিন-রাতের পরিবর্তন এবং নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ সবকিছুই উত্তর-দক্ষিণ অক্ষের ওপর নির্ভর করে। পূর্ব-পশ্চিম দিক মূলত পর্যবেক্ষণ ও মানচিত্র তৈরির সুবিধার জন্য ব্যবহৃত হয়।
সহজভাবে বললে যেহেতু পূর্ব বা পশ্চিমে কোনো চূড়ান্ত প্রান্ত নেই, তাই সেখানে কোনো মেরুও নেই।
| শেষ কথা |
পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু আছে কারণ পৃথিবী একটি নির্দিষ্ট অক্ষের ওপর ঘুরছে। উত্তর ও দক্ষিণ মেরু হলো পৃথিবীর প্রকৃত শেষ বিন্দু। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম কোনো অক্ষের প্রান্ত নয়, বরং মানুষের নির্ধারিত আপেক্ষিক দিক। পূর্ব ও পশ্চিম হলো কেবল দিকনির্দেশনা। তাই পৃথিবীতে পূর্ব–পশ্চিম মেরু বলে কিছু নেই।
নিবন্ধ: এফ. রহমান
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, image.gsfc.nasa.gov/poetry/ask/a10840.html,উইকিপিডিয়া