আলোর ভাষায় মহাবিশ্ব |
আমরা যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাই, তখন যে অসংখ্য তারা, গ্রহ আর গ্যালাক্সি দেখি, সেগুলো আসলে আমাদের সঙ্গে কথা বলে আলোর মাধ্যমে। কোটি কোটি কিলোমিটার দূর থেকে ছুটে আসা আলোই মহাবিশ্বের ইতিহাস, গঠন এবং পরিবর্তনের গল্প আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়।
আলো ছাড়া মহাবিশ্বকে জানার, বোঝার বা কল্পনা করার কোনো উপায়ই নেই। আলোর ভাষায় মহাবিশ্ব মানে হলো সেই আলোকে বোঝার চেষ্টা করা, যা নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, গ্যালাক্সির গতি, এমনকি সময়ের গভীর অতীতের খবর বহন করে।
টেলিস্কোপ ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা আজ আলোর রঙ, তীব্রতা ও তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচন করছেন। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানার চেষ্টা করব, কীভাবে আলোই আমাদের মহাবিশ্ব বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভাষা হয়ে উঠেছে।
| আলো কী? (What is Light?) |
আলো হলো এক ধরনের শক্তি এবং একইসাথে এক ধরনের তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ, যা তরঙ্গ ও কণা—এই দুইভাবেই আচরণ করতে পারে। আলো আমাদের চোখে দৃশ্যমান হলেও বাস্তবে এটি একটি বিশাল তড়িৎচৌম্বক বর্ণালির খুব ছোট অংশ মাত্র। যা শূন্যস্থানে কোনো মাধ্যম ছাড়াই তরঙ্গ আকারে চলাচল করতে পারে। আলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে, আর এই গতির কারণেই আমরা সূর্য, তারা, গ্রহ এবং আমাদের চারপাশের বস্তুগুলো দেখতে পাই। কোনো বস্তু থেকে নির্গত বা প্রতিফলিত আলো যখন আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়, তখনই সেই বস্তুটি আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয়।
বৈজ্ঞানিকভাবে আলোকে তড়িৎচৌম্বক বর্ণালির একটি অংশ হিসেবে ধরা হয়। এই বর্ণালির মধ্যে রেডিও তরঙ্গ থেকে শুরু করে গামা রশ্মি পর্যন্ত নানা ধরনের বিকিরণ রয়েছে। এর মধ্যে মানুষের চোখ কেবল দৃশ্যমান আলোই গ্রহণ করতে পারে, যাকে বলা হয় visible light। এই দৃশ্যমান আলো বিভিন্ন রঙ নিয়ে গঠিত, যেমন লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল ও বেগুনি।
আলো শুধু দেখার মাধ্যমই নয়, এটি শক্তি বহন করে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সূর্যের আলো পৃথিবীতে তাপ সরবরাহ করে, উদ্ভিদের আলোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া চালু রাখে এবং জীবজগতের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য পরিবেশ সৃষ্টি করে।

জ্যোতির্বিদ্যায় আলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে নক্ষত্রের তাপমাত্রা, গঠন, গতি এবং দূরত্ব সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য জানা সম্ভব হয়। একটি telescope কীভাবে কাজ করে, তা সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে আমাদের আগে electromagnetic radiation সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ টেলিস্কোপ মূলত এই বিকিরণকেই সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে আমাদের চোখের সামনে মহাবিশ্বকে তুলে ধরে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে যেসব আলো দেখতে পাই, সেগুলোকে বলা হয় visible light বা দৃশ্যমান আলো। এই দৃশ্যমান আলোও আসলে electromagnetic radiation-এরই একটি অংশ।
মজার বিষয় হলো, আমাদের আশেপাশে এমন অনেক বস্তু রয়েছে যেগুলো radiation নির্গত করে, কিন্তু আমরা সেগুলো চোখে দেখতে পাই না। যেমন, radio এবং television-এ যে radiation-এর মাধ্যমে সিগন্যাল আদান-প্রদান হয়, তা আমরা সরাসরি দেখতে সক্ষম নই। আবার একটি electric heater বা oven থেকে যে thermal radiation নির্গত হয়, সেটিও আমরা চোখে দেখি না, কিন্তু তার তাপ স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারি।
যে স্কেলের মাধ্যমে wavelength-এর উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের electromagnetic radiation-এর অবস্থান দেখানো হয়, সেটিকেই বলা হয় electromagnetic spectrum। এই spectrum-এর মধ্যে radio wave, infrared radiation, visible light, ultraviolet light, X-ray এবং gamma ray অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই বিস্তৃত বর্ণালির মধ্যে আমাদের চোখ দিয়ে আমরা কেবলমাত্র visible light বা দৃশ্যমান আলোই দেখতে সক্ষম।

নিচে একটি Electromagnetic Spectrum দেখানো হলো—
| আলোর ইতিহাস ও জনক |
আলো নিয়ে গবেষণার ইতিহাস বহু পুরোনো। মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইথাম (Alhazen) (৯৬৫–১০৩৯) -কে আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
আলোকবিজ্ঞানে এক অসামান্য সংযোজন হলো ‘কিতাবুল মানাজির’, যার ১৫–১৬ অধ্যায়ে তিনি জ্যোতির্বিদ্যার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। শুধু আলোকবিজ্ঞানই নয়, তাঁর চিন্তাধারা জ্যোতির্বিদ্যা ও পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিকে আরও মজবুত করে। এছাড়াও তাঁর রচিত মিযান আল-হিক্মাহ্ (Balance of Wisdom) এবং মাক্বাল ফি দ্য আল-ক্বামার (On the Light of the Moon) গ্রন্থদ্বয়ে তিনি সর্বপ্রথম গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যার মধ্যে সমন্বয় সাধনের একটি সুস্পষ্ট চেষ্টা চালান, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আলোকবিজ্ঞানে যেসকল বিজ্ঞানী অবদান রেখেছেন
- প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ইউক্লিড আলো ও দৃষ্টির জ্যামিতিক ব্যাখ্যা দেন। তিনিই প্রথম পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে আলো বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে চোখে আসে।
- আধুনিক যুগে আইজ্যাক নিউটন আলোকে কণার মতো ব্যাখ্যা করেন।
- পরে ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস আলোকে তরঙ্গ হিসেবে ব্যাখ্যা দেন।
- আর আলবার্ট আইনস্টাইন দেখান, আলো একই সঙ্গে তরঙ্গ ও কণা—দুইভাবেই আচরণ করে।
| আলোর প্রকৃতি The Nature of Light |
আমরা সবাই আলোর সঙ্গে পরিচিত। আলোই আমাদের চারপাশের জগতকে দেখতে সাহায্য করে। আমাদের চোখে যা কিছু ধরা পড়ে, তার সবই সম্ভব হয় আলোর কারণে।
তবে আলো শুধু দেখার মাধ্যম হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক চমকপ্রদ ও বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
| তরঙ্গ হিসেবে আলো Light as Waves |
| বিচ্ছুরণ (Diffraction) |

আলো যে তরঙ্গের মতো আচরণ করে, তা বোঝার জন্য খুব জটিল কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। যদি দেয়ালের একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে আলো ফেলা হয়, তাহলে বিষয়টি সহজেই লক্ষ্য করা যায়। দেয়ালের অপর পাশে কোনো পর্দায় যে আলোর ছবি তৈরি হয়, তা একেবারে পরিষ্কার একটি বিন্দু হয় না। বরং সেখানে একাধিক বৃত্তাকার আলোর বলয় দেখা যায়। এই বৃত্তাকার আলোর বলয়গুলোকেই বলা হয় বিচ্ছুরণ বলয় (diffraction rings)।

চিত্র ৭৩: বিচ্ছুরণ বলয়
চিত্র ৭৩–এ পিনহোল দিয়ে আলো প্রবেশ করালে কীভাবে এই বিচ্ছুরণ প্রভাব তৈরি হয়, তা দেখানো হয়েছে।
টেলিস্কোপে যখন কোনো বস্তু অনেক বেশি আউট অব ফোকাস অবস্থায় থাকে, তখন ঠিক একই ধরনের প্রভাব চোখে পড়ে।
চিত্র ৭৩: বিচ্ছুরণ বলয় চিত্র ৭৪–এ বিচ্ছুরণ বলয় তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ও আলোর আচরণ দেখানো হয়েছে। এখানে লাল রেখাগুলো আলোর তরঙ্গের শীর্ষ (crest) নির্দেশ করে, আর লাল রেখার মাঝখানের সাদা অংশগুলো তরঙ্গের খাদ বা উপত্যকা (valley বা trough) বোঝায়।

চিত্র ৭৪: বিচ্ছুরণ বলয় সৃষ্টির প্রক্রিয়া
| প্রতিসরণ (Refraction) |

চিত্র ৭৫: প্রতিসরণ
আলো যখন এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন সেই আলোক তরঙ্গগুলোর চলার পথ বাঁকিয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আলো যখন বাতাস থেকে কোনো লেন্সের কাচে প্রবেশ করে, তখন তার পথ বেঁকে যায়। এই বিষয়টি চিত্র ৭৫–এ দেখানো হয়েছে।
এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই রিফ্র্যাক্টিং টেলিস্কোপ এবং দূরবীনের লেন্সগুলো কাজ করে। আলোর বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় বাঁক নেয়। লেন্সের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় লাল আলো নীল আলোর তুলনায় কম বাঁকে।
| প্রতিফলন (Reflection) |

চিত্র ৭৬: প্রতিফলন
আলো যখন কোনো প্রতিফলক পৃষ্ঠের সংস্পর্শে আসে, তখন তা যে কোণে এসে পড়ে, ঠিক সেই একই কোণে ফিরে যায়।
এই নীতিটিই রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপের আয়নায় ব্যবহার করা হয়। একইভাবে দূরবীনের ভেতরে থাকা প্রিজমগুলোর কাজের পেছনেও এই প্রতিফলনের নীতিই কাজ করে (চিত্র ৭৬ দেখুন)।
| তরঙ্গের অংশসমূহ |
চিত্র ৭৭–এ একটি তরঙ্গ দেখানো হয়েছে এবং এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সেগুলো হলো—
- শীর্ষ (Crest) – প্রতিটি তরঙ্গের উপরের অংশ
- খাদ বা উপত্যকা (Trough) – প্রতিটি তরঙ্গের নিচের অংশ
- তরঙ্গদৈর্ঘ্য (Wavelength, λ) – পরপর দুটি শীর্ষ বা দুটি খাদ-এর মধ্যকার দূরত্ব। সাধারণত এটি ন্যানোমিটার (nm) এককে প্রকাশ করা হয়
- অ্যাম্প্লিটিউড (Amplitude, a) – সাম্য অবস্থার উপরে তরঙ্গের উচ্চতা•সাম্য অবস্থা (Equilibrium State) – যে রেখায় অ্যাম্প্লিটিউডের মান শূন্য থাকে

চিত্র ৭৭: তরঙ্গের অংশসমূহ
| আলোর আরও কিছু বৈশিষ্ট্য |
উপরের বৈশিষ্ট্যগুলোর পাশাপাশি আলো সম্পর্কে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা প্রয়োজন।
- বেগ (Velocity, c)
শূন্য মাধ্যমে আলো সর্বোচ্চ যে গতিতে চলে, তাকে আলোর বেগ বলা হয়। এর মান ২৯৯,৭৯২ কিলোমিটার/সেকেন্ড বা ১৮৬,২৮২ মাইল/সেকেন্ড। সহজ হিসাবের জন্য এখানে আমরা ৩০০,০০০ কিলোমিটার/সেকেন্ড বা ১৮৬,০০০ মাইল/সেকেন্ড ধরে নিই। সমীকরণে আলোর বেগকে “c” দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
- ফ্রিকোয়েন্সি (Frequency, f)
কোনো আলোক তরঙ্গ আপনার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতি সেকেন্ডে যতগুলো শীর্ষ অতিক্রম করে, সেটিই তার ফ্রিকোয়েন্সি। প্রতি সেকেন্ডে ১টি শীর্ষ অতিক্রম করলে তাকে ১ হার্টজ (Hz) বলা হয়। ফ্রিকোয়েন্সির মান পাওয়া যায় আলোর বেগকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ করলে।
- পর্বকাল (Period, P)
একটি তরঙ্গের একটি শীর্ষ থেকে পরবর্তী শীর্ষ পর্যন্ত আপনার পাশ দিয়ে যেতে যে সময় লাগে, সেটিই পর্বকাল। পর্বকাল আসলে ফ্রিকোয়েন্সির বিপরীত মান।
সমীকরণ ২: ফ্রিকোয়েন্সি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও পর্বকাল
f = c / λ
λ = c / f
P = 1 / f