| কণা হিসেবে আলো (ফোটন) Light as Particles (photons) |
আলো শুধু তরঙ্গের মতো আচরণ করে না, এটি একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও ভরহীন কণার মতোও আচরণ করতে পারে। এই ক্ষুদ্র কণাগুলোকেই বলা হয় ফোটন।The Photoelectric Effect
আলোর এই কণাধর্মী স্বভাব প্রমাণ করার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট নিয়ে গবেষণা করেন এবং এর জন্য তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
ফটোইলেকট্রিক প্রভাবই আলোর কণাধর্মী প্রকৃতির একটি শক্ত প্রমাণ।কম ফ্রিকোয়েন্সির আলো, যেমন ইনফ্রারেড আলো ও লাল আলো, ধাতব পৃষ্ঠ থেকে ইলেকট্রন বের করে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তবে ফ্রিকোয়েন্সি যত বাড়তে থাকে, আলোর শক্তিও তত বাড়ে।
এক পর্যায়ে আলোর শক্তি যথেষ্ট হলে ধাতব পৃষ্ঠ থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে আসে। উচ্চ শক্তির ফোটন ইলেকট্রনকে আরও বেশি বেগে ছিটকে দেয়। আবার একই ফ্রিকোয়েন্সির আলো হলেও যদি বেশি সংখ্যক ফোটন ধাতব পৃষ্ঠে পড়ে, তাহলে আরও বেশি ইলেকট্রন নির্গত হয়।
সমীকরণ ৩: ফোটনের শক্তি
e = h × f
এখানে,
h হলো প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক (Planck’s Constant)
h = 6.626176 × 10⁻³⁴ জুল-সেকেন্ড
এভাবে দেখা যায়, আলো কখনো তরঙ্গের মতো, আবার কখনো কণার মতো (ফোটন) আচরণ করতে পারে।
| তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ ও মহাশূন্য Electromagnetic Radiation and the Vacuum of Space |
বাতাসে শব্দ তরঙ্গ কিংবা পানিতে তরঙ্গ চলতে হলে পরমাণু ও অণুগুলোর স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। এ কারণেই সিনেমা Alien-এর বিখ্যাত সংলাপ, “In space no one can hear you scream” পুরোপুরি সঠিক। মহাশূন্য প্রায় শূন্য মাধ্যম হওয়ায় সেখানে শব্দ তরঙ্গ চলতে পারে না।
কিন্তু তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। আলোর তরঙ্গ শূন্য মাধ্যম দিয়েও চলতে পারে। যদি আলো শূন্য মাধ্যমে চলতে না পারত, তাহলে মহাশূন্য সত্যিকারের শূন্য হতে পারত না, কিংবা আমরা আমাদের বায়ুমণ্ডলের বাইরের কিছুই দেখতে পেতাম না। সে ক্ষেত্রে পৃথিবী হতো ঠান্ডা ও অন্ধকার।
কিন্তু বাস্তবে আমরা নক্ষত্র দেখতে পাই, সূর্যের আলো পাই এবং জানি যে মহাশূন্য সত্যিই প্রায় শূন্য মাধ্যম। তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের চলার জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। এটি মহাশূন্যের শূন্য মাধ্যম দিয়েই চলতে সক্ষম।
তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ হলো শক্তি পরিবহনের এমন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে শক্তি তরঙ্গ আকারে স্থান দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিকিরণ তৈরি হয় বিদ্যুৎ ও চৌম্বক ক্ষেত্রের পারস্পরিক দোলনের ফলে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ চলতে কোনো মাধ্যমের দরকার হয় না। তাই এটি শূন্যস্থান দিয়েও চলতে পারে। সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছায় ঠিক এই কারণেই।
তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের গতি শূন্যস্থানে আলোর গতির সমান, প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। এই বিকিরণের তরঙ্গের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য আছে—তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং কম্পাঙ্ক। তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও কম্পাঙ্কের ভিন্নতার কারণে তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের বিভিন্ন রূপ দেখা যায়।
সব তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ মিলেই গঠিত হয় তড়িৎচৌম্বক বর্ণালী। এর মধ্যে রয়েছে রেডিও তরঙ্গ, মাইক্রোওয়েভ, অবলোহিত রশ্মি, দৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স-রে এবং গামা রশ্মি। আমাদের চোখে যে আলো দেখা যায়, সেটি এই বর্ণালীর খুব ছোট একটি অংশ মাত্র।
তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গভীরভাবে জড়িত। রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচার, মোবাইল ফোন, ওয়াই-ফাই, রান্নায় মাইক্রোওয়েভ ওভেন, চিকিৎসায় এক্স-রে এবং সূর্যের আলো—সবকিছুই তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের ব্যবহার বা প্রভাবের উদাহরণ।
সংক্ষেপে বলা যায়, তড়িৎচৌম্বক বিকিরণ প্রকৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তি বোঝার একটি মৌলিক ধারণা, যা মহাবিশ্ব থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত সর্বত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের ধরনগুলো হলো—
রেডিও, ইনফ্রারেড আলো, দৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনি আলো, এক্স-রে এবং গামা রশ্মি।
| দৃশ্যমান আলো (Visible Light) |
দৃশ্যমান আলো তড়িৎচৌম্বক বর্ণালির খুবই ছোট একটি অংশ মাত্র। পুরো তড়িৎচৌম্বক বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক (Electromagnetic বা EM) বর্ণালিতে এমন অনেক ধরনের বিকিরণ রয়েছে, যেগুলো আমরা আমাদের চোখে দেখতে পাই না।
আমরা যে আলো চোখে দেখতে পাই, তার পরিসর লাল রং থেকে বেগুনি রং পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অংশটিকেই বলা হয় দৃশ্যমান আলোর বর্ণালি (Visible Light Spectrum)। বাস্তবে লাল থেকে কমলা, তারপর ধীরে ধীরে বেগুনি পর্যন্ত রংগুলোর মধ্যে কোনো হঠাৎ সীমারেখা নেই; বরং সব রং ধীরে ধীরে একে অন্যের মধ্যে পরিবর্তিত হয়।
তবে বোঝার সুবিধার জন্য এই রংগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে— লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল ও বেগুনি।এই রংগুলোর তালিকাটি সহজে মনে রাখার জন্য ROYGBV শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, “I” নেই। কারণ ইন্ডিগো (Indigo) মূলত গভীর নীল রঙেরই একটি রূপ। পরে আলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আপাতত প্রাথমিক ধারণাগুলো জানা থাকলেই যথেষ্ট।
চিত্র ৭৯: দৃশ্যমান আলোর বর্ণালি
দৃশ্যমান আলো গঠিত হয় লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল ও বেগুনি রঙ দিয়ে। আলোর ভিন্ন ভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি আমাদের বিভিন্ন শক্তিস্তরের ঘটনাগুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে।
লাল রং থেকে বেগুনি রঙের দিকে যেতে যেতে আলোর ফ্রিকোয়েন্সি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
লাল রং থেকে বেগুনি রঙের দিকে গেলে ফোটনের শক্তিও ক্রমশ বাড়তে থাকে।
লাল রং থেকে বেগুনি রঙের দিকে যেতে যেতে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ধাপে ধাপে ছোট হতে থাকে।
| রেডিও তরঙ্গ (Radio Waves) |
রেডিও তরঙ্গের শক্তি ও ফ্রিকোয়েন্সি খুবই কম। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রেডিও সম্প্রচার, টেলিভিশন সম্প্রচার, মোবাইল ফোন এবং GPS ব্যবস্থায় এই রেডিও তরঙ্গ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া স্যাটেলাইট ও মহাকাশযানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও রেডিও তরঙ্গই প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।ইনফ্রারেড আলো লাল আলোর চেয়েও আরও “লালচে”, অর্থাৎ এটি লাল আলোর পরের অংশে অবস্থান করে এবং আমাদের চোখে দেখা যায় না। রোদেলা দিনে বাইরে গেলে যে আরামদায়ক উষ্ণতা আমরা অনুভব করি, সেই তাপ মূলত সূর্য থেকে আগত ইনফ্রারেড বিকিরণের ফলঅতিবেগুনি আলো বেগুনি আলোর তুলনায় আরও বেশি শক্তিশালী। এটিও আমাদের চোখে দেখা যায় না। ট্যানিং স্যালনে যে ধরনের বিকিরণ ব্যবহার করা হয়, তা মূলত অতিবেগুনি রশ্মি। এই বিকিরণই সানবার্ন, ত্বকের ক্যান্সার এবং চোখে ক্যাটারাক্ট হওয়ার জন্য দায়ী।

এর চেয়েও বেশি শক্তি ও ফ্রিকোয়েন্সি থাকে এক্স-রে বিকিরণে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এক্স-রে ব্যবহার করে আমরা পেশি ও ত্বকের বাধা ছাড়াই হাড় ও দাঁতের ভেতরের গঠন স্পষ্টভাবে দেখতে পারি।তড়িৎচৌম্বক বর্ণালির একেবারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে গামা রশ্মি। এই রশ্মিগুলোর শক্তি ও ফ্রিকোয়েন্সি অত্যন্ত বেশি। দৈনন্দিন জীবনে এই বিকিরণের তেমন কোনো সাধারণ বা সরাসরি ব্যবহার নেই।চিত্র ৮০: তড়িৎচৌম্বক বর্ণালি
এই সম্পূর্ণ তড়িৎচৌম্বক বর্ণালির মধ্যেই দৃশ্যমান আলো একটি খুবই ক্ষুদ্র অংশ। তবে এই ছোট অংশের মাধ্যমেই আমরা আমাদের চারপাশের মহাবিশ্বকে চোখে দেখতে পাই।
| আলোর ভাষা The Language of Light |
কোনো বস্তুর বর্ণালি বা স্পেকট্রাম (spectrum) বিশ্লেষণ করলে সেই বস্তু সম্পর্কে অসাধারণ পরিমাণ তথ্য জানা সম্ভব হয়। নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো—কোন কোন বিষয় পরিমাপ করা যায় এবং সেগুলো আমাদের কী ধরনের তথ্য দেয়।
- সর্বোচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি (Peak Frequency) – বস্তুর তাপমাত্রা
কোনো বস্তু থেকে নির্গত আলোর সর্বোচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি নির্ণয় করলে তার পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সম্পর্কে জানা যায়। কিছু নক্ষত্র এতটাই উত্তপ্ত যে তাদের সর্বোচ্চ বিকিরণ দৃশ্যমান আলোর অংশে পড়ে না; বরং তা অতিবেগুনি (Ultraviolet) অংশে অবস্থান করে।
- ডপলার শিফট (Doppler Shift) – বস্তুর সরে যাওয়ার বেগ
বর্ণালিতে পরিচিত রেখাগুলোর ফ্রিকোয়েন্সিতে পরিবর্তন দেখা গেলে বোঝা যায় যে বস্তুটি কত দ্রুত আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে অথবা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এই তথ্যটি দূরবর্তী গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে যখন এটি হাবলের সূত্রের (Hubble’s Law) সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
- রেখার উপস্থিতি (Presence of Lines) – বস্তুর গঠন বা উপাদান
প্রতিটি মৌলের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র স্বাক্ষর থাকে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু বর্ণালি রেখা। এই রেখাগুলো বিশ্লেষণ করে কোনো বস্তুর মধ্যে কোন কোন মৌল বা অণু উপস্থিত রয়েছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব। এমনকি মাঝখানে থাকা কোনো ধূলিকণার মেঘের গঠন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। এই রেখাগুলো সবসময় দৃশ্যমান আলোর অংশেই থাকতে হবে, এমন নয়। এগুলো রেডিও, ইনফ্রারেড, দৃশ্যমান কিংবা অতিবেগুনি—যেকোনো অংশে অবস্থান করতে পারে।
চিত্র ১৪১: ঘূর্ণায়মান নক্ষত্র থেকে আগত আলো
- রেখার প্রস্থ (Width of the Lines) – ঘূর্ণন, তাপমাত্রা, অস্থিরতা ও চৌম্বক ক্ষেত্র
বর্ণালির রেখাগুলোর প্রস্থ বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে পরিবর্তিত হয়। একটি রেখা কতটা চওড়া হবে, তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে।
যদি কোনো বস্তু ঘূর্ণায়মান হয়, তাহলে তার এক পাশ আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যায় এবং সেই অংশের আলো লাল দিকে সরে যায়, যাকে রেড-শিফট বলা হয়।
অন্য পাশ আমাদের দিকে এগিয়ে আসে, ফলে সেখানে নীল দিকে সরে যাওয়ার প্রভাব বা ব্লু-শিফট দেখা যায়। এই দুই দিকের প্রভাব একসঙ্গে মিলিত হয়ে বর্ণালিতে একটি তুলনামূলকভাবে চওড়া রেখা তৈরি করে, যা মূল ফ্রিকোয়েন্সির আশেপাশে কেন্দ্রীভূত থাকে।
তাপমাত্রা বেশি হলে পরমাণু ও অণুগুলো দ্রুত গতিতে নড়াচড়া করে। ফোটন নির্গমনের সময় যদি তারা পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে আলো লাল দিকে সরে যায়, আর কাছে এলে নীল দিকে সরে যায়। এই ভিন্ন ভিন্ন ফোটনের সম্মিলিত প্রভাব রেখাকে আরও চওড়া করে তোলে। অস্থিরতা বা টার্বুলেন্সও একই ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতিতে প্রতিটি শক্তিস্তর পরিবর্তনের জন্য একাধিক কাছাকাছি রেখা তৈরি হতে পারে। অনেক সময় এই রেখাগুলো এত কাছাকাছি অবস্থান করে যে আলাদা করে শনাক্ত করা যায় না, বরং একসঙ্গে মিলিয়ে একটি চওড়া রেখার মতো দেখা যায়।
এইভাবেই আলোর বর্ণালি আসলে একটি ভাষার মতো কাজ করে, যার মাধ্যমে মহাবিশ্ব নিজেই আমাদের কাছে তার গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট
নিবন্ধ: এফ. রহমান